×

মুক্তচিন্তা

নতুন ভারসাম্যের সন্ধানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

Icon

সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম

নতুন ভারসাম্যের সন্ধানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। ভৌগোলিক সান্নিধ্য, ইতিহাসের বন্ধন এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার কারণে এই সম্পর্ককে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী দশকগুলোতে নানা ওঠানামার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ নীতির ভিন্নতার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কোন ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন হবে এবং কীভাবে পারস্পরিক আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মূল শক্তি দেশ দুটির ইতিহাস। কিন্তু একইসঙ্গে এই ইতিহাসই কখনো কখনো প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান তৈরি করে। স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তবে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের কারণে দূরত্বও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব সম্পর্ককে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তবুও গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ, সংযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থলবন্দর উন্নয়ন, রেল ও সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, বিদ্যুৎ আমদানি, ট্রানজিট সুবিধা—এসবই একটি আন্তঃনির্ভরশীল সম্পর্কের দিকে নিয়ে গেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। তবে এই সম্পর্ক এখনো ভারসাম্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অনেক বেশি পণ্য আমদানি করে, যেখানে রপ্তানি তুলনামূলক কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও এর বড় অংশই ভারতের পক্ষে। বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও কিছু হালকা শিল্পপণ্য রপ্তানি করে। আর ভারত থেকে আসে কাঁচামাল, খাদ্যশস্য, যন্ত্রপাতি ও ভোক্তা পণ্য। এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের মধ্যে একটি অস্বস্তি তৈরি করে। যা দূর করতে হলে বাংলাদেশকে রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে এবং ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার আরও সহজ করতে হবে।

সংস্কৃতি ও মানুষের সংযোগ এই সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি। দুই দেশের মানুষের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র এবং ঐতিহ্যের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এই মিল প্রতিফলিত হয়। শিক্ষার্থী, পর্যটক, চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগী—সব মিলিয়ে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করে। এই ‘পিপল-টু-পিপল’ সংযোগ রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়েও সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সম্পর্কের এই ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু সংবেদনশীল ইস্যুও রয়েছে, যা সমাধান না হলে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। সীমান্তে প্রাণহানি, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা, বাণিজ্য বাধা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারস্পরিক সন্দেহ সম্পর্কের অগ্রগতিকে সীমিত করে। বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। একইভাবে সীমান্তে সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সম্পর্কের মানবিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে কিছুটা শীতলতা লক্ষ্য করা গেছে—বিশেষ করে নীতিগত অবস্থান, আঞ্চলিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান নিয়ে ভিন্নতার কারণে। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের সময় এই সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। 

এই সম্পর্ক উন্নয়নে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, আস্থার সংকট দূর করা জরুরি। রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে এসে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে দেখাতে হবে যে দুই দেশই পরস্পরের স্বার্থকে সম্মান করে। সীমান্তে সহিংসতা বন্ধ, পানিবণ্টন চুক্তির অগ্রগতি এবং বাণিজ্য বাধা কমানো—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে। বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর জন্য কূটনৈতিকভাবে কাজ করতে হবে, পাশাপাশি নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যৌথ বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, প্রযুক্তি স্থানান্তর—এসব উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে বাংলাদেশে কিছু বিনিয়োগ করেছে তবে সেই সম্ভাবনা আরও অনেক বেশি। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক, রেল, নৌ ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ উন্নত হলে শুধু দুই দেশই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া উপকৃত হবে। বাংলাদেশ এই সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে যা তাকে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। চতুর্থত, সংস্কৃতি ও জনগণের সংযোগ আরও জোরদার করতে হবে। যৌথ সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, মিডিয়া সহযোগিতা— এসব উদ্যোগ সম্পর্কের মানবিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করবে। রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই পরিবর্তিত হোক, মানুষের সংযোগই দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। পঞ্চমত, কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশকে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে ভারতসহ সব বড় অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যায় কিন্তু কোনো একটির ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি না হয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

সবশেষে বলা যায়, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে পারস্পরিক আস্থা, বাস্তববাদী কূটনীতি এবং সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা। ইতিহাসের বন্ধন যেমন এই সম্পর্ককে শক্তি দিয়েছে, তেমনি বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলো এটিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বার্থনির্ভর কৌশল নিতে হবে আর ভারতেরও উচিত সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে সম্পর্ককে মূল্যায়ন করা। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায় যদি পারস্পরিক সম্মান ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়ায় তবে তা শুধু দুই দেশের জন্যই নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্যও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে

আইনমন্ত্রী সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হবে

অধিনায়ক হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে যে রেকর্ড শুধুই বাবরের

অধিনায়ক হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে যে রেকর্ড শুধুই বাবরের

সংরক্ষিত নারী আসনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, গেজেট কাল

সংরক্ষিত নারী আসনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, গেজেট কাল

লিটারে ৪ টাকা বাড়ল বোতলজাত তেলের দাম

লিটারে ৪ টাকা বাড়ল বোতলজাত তেলের দাম

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App