×

বিশেষ সংখ্যা

‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ : বার্তা নয়, যেন বিবেকের বাণী

Icon

নুসরাত জাহান সূচনা

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১০:০২ এএম

‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ : বার্তা নয়, যেন বিবেকের বাণী

‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ : বার্তা নয়, যেন বিবেকের বাণী

১৯৭১ সালের মার্চ মাস- ইতিহাসের এক অগ্নিঝরা অধ্যায়। পৃথিবীর মানচিত্রে একটি নতুন নাম, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের প্রত্যাশায় তখন রক্তে, ত্যাগে আর অদম্য সাহসে জেগে উঠেছিল বাঙালি জাতি। চারদিকে সংগ্রামের উত্তাপ, মানুষের চোখে মুক্তির স্বপ্ন, আর বুকভরা দৃঢ় সংকল্প- এই সবকিছু মিলেই রচিত হচ্ছিল এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল, তখন চারদিক জুড়ে ছিল আতঙ্ক, ধ্বংস আর নিঃশব্দ আর্তনাদ। ঠিক সেই ভয়াল সময়েই মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ঢাকা কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড।

সরকারি অবস্থানের বাইরে গিয়ে, সত্যকে তুলে ধরার সাহস দেখান তিনি। তার পাঠানো প্রতিবাদী বার্তাটি- যা ইতিহাসে ব্লাড টেলিগ্রাম নামে পরিচিত; শুধু একটি কূটনৈতিক দলিল নয়, বরং মানবতার পক্ষে এক জোরালো উচ্চারণ হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

সম্প্রতি এই টেলিগ্রামের গুরুত্ব আবারও নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে, মার্কিন কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান একটি প্রস্তাব পেশ করেছেন যেখানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই প্রস্তাবে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে আর্চার ব্লাডের সেই বিখ্যাত টেলিগ্রামের কথা।

যে কূটনীতিক ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছিলেন

আর্চার ব্লাড ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ কনসাল জেনারেল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রও নীরব ছিল। কিন্তু ব্লাড চুপ করে থাকেননি।

২৮ মার্চ, ১৯৭১-এ তিনি ওয়াশিংটনে একটি জরুরি টেলিগ্রাম পাঠান, যার শিরোনাম ছিল ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ (বাছাই করা গণহত্যা)। সেই টেলিগ্রামে তিনি লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সমর্থনে অ-বাঙালি মুসলমানরা পদ্ধতিগতভাবে দরিদ্র জনপদে আক্রমণ চালিয়ে বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছে’ । মাত্র তিন দিনের মধ্যে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন যে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং একটি গণহত্যা।

‘ওভারইউজড টার্ম জেনোসাইড’

ব্লাড টেলিগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল ৬ এপ্রিল, ১৯৭১-এ পাঠানো আরেকটি বার্তা। এই বার্তায় তিনি কেবল নিজে নন, ঢাকা কনসুলেটের ২০ জন সদস্য যৌথভাবে মার্কিন সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান । এটি ছিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ইতিহাসে নিজস্ব কর্মকর্তাদের দ্বারা সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ।

সেই টেলিগ্রামের ভাষ্য আজও ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে

‘আমাদের সরকার গণতন্ত্র দমনের নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার নৃশংসতার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে।  আমরা হস্তক্ষেপ করতে চাইনি, এমনকি নৈতিকভাবেও নয়, এই যুক্তিতে যে আওয়ামী সংঘাত, যার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে অতিরিক্ত ব্যবহৃত শব্দ ‘গণহত্যা’ প্রযোজ্য, তা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ ।

এই সাহসী পদক্ষেপের জন্য ব্লাডকে মূল্য দিতে হয়েছিল। তার কূটনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এবং তিনি কখনো রাষ্ট্রদূত হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তাকে কখনো ভোলেনি ।

কেন যুক্তরাষ্ট্র নীরব ছিল?

প্রশ্ন জাগে, ব্লাডের মতো একজন কর্মকর্তা যখন সরাসরি গণহত্যার প্রমাণ দিচ্ছিলেন, তখন মার্কিন প্রশাসন কেন নীরব ছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্নায়ুযুদ্ধের জটিল সমীকরণে।

১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। পাকিস্তান তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সেতু হিসেবে কাজ করছিল। কিসিঞ্জারের চীনের প্রথম গোপন সফরটিও পাকিস্তানের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল।

এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা নিক্সন প্রশাসনের কাছে গৌণ হয়ে পড়েছিল। গ্যারি জে বাস তার ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’ বইয়ে এই নৈতিক ব্যর্থতাকে ‘মোরাল ব্লাইন্ডনেস’ (নৈতিক অন্ধত্ব) হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ।

ব্লাড টেলিগ্রামের তাৎপর্য

ব্লাড টেলিগ্রাম শুধু একটি কূটনৈতিক বার্তা ছিল না; এটি ছিল একটি বিবেকের দলিল। সেই সময়ে যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে চুপ ছিল, তখন একজন সাধারণ কূটনীতিক তার মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

এই টেলিগ্রামের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায় যখন আমরা দেখি যে ৫৫ বছর পরেও এটি একটি প্রস্তাবের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান যে প্রস্তাবটি পেশ করেছেন, সেখানে ব্লাড টেলিগ্রামকে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ হিসেবে উল্লেখ করে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বিচার আক্রমণের কথা তুলে ধরা হয়েছে ।

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন: টেলিগ্রামের ভবিষ্যদ্বাণী

ব্লাড টেলিগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এটি সংখ্যালঘুদের ওপর বিশেষ নিপীড়নের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিল। সাম্প্রতিক কংগ্রেসের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং জামায়াত-ই-ইসলামীর মতো সংগঠনগুলো ‘বিশেষভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের নির্মূল করার লক্ষ্য স্থির করেছিল’ এবং তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তরিতকরণ ও জোরপূর্বক বহিষ্কারের মতো অপরাধ সংঘটিত করেছিল ।

এই বর্ণনা ব্লাডের ১৯৭১ সালের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি দেখেছিলেন যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুধু বাঙালি জাতিকেই নয়, বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করছিল ।

আর্চার ব্লাড ২০০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এমন একটি দলিল, যা আজও ইতিহাসের সঠিক পথনির্দেশ দিচ্ছে। তার টেলিগ্রাম প্রমাণ করে যে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কখনো ব্যর্থ হয় না।

২০২৬ সালের এই প্রস্তাবটি ব্লাড টেলিগ্রামের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘সম্পূর্ণ জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের সদস্যদের সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ী নয়’ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেন এই গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেন ।

ব্লাড টেলিগ্রাম ১৯৭১ এর সেই নৃশংসতার একটি প্রামাণিক দলিল, যেখানে বিবেকের কণ্ঠস্বর কূটনীতির ঠান্ডা ভাষাকে জয় করেছিল। আর্চার ব্লাড দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক স্বার্থের চেয়েও বড় সত্য রয়েছে।

আজ যখন বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করছে, সেই সময়ে ব্লাড টেলিগ্রামের মতো দলিল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। আর সেই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

আর্চার ব্লাড হয়তো একজন কূটনীতিক ছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি সেই ব্যক্তি যিনি সবচেয়ে কঠিন সময়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তার পাঠানো সেই টেলিগ্রাম আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে- একটি বিবেকের বাণী যা সময়ের আবর্তনে আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

লেখক: সাংবাদিক

টাইমলাইন: মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২০২৬

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভারতে বাস-লরির সংঘর্ষে নিহত ১৩

ভারতে বাস-লরির সংঘর্ষে নিহত ১৩

স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালো ঢাবি

স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালো ঢাবি

দেশেরে বাজারে ফের কমলো স্বর্ণের দাম

দেশেরে বাজারে ফের কমলো স্বর্ণের দাম

ইরানকে ড্রোন, খাদ্য ও ওষুধ সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া

ইরানকে ড্রোন, খাদ্য ও ওষুধ সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App