হামে প্রাণ গেছে ৪০৯ শিশুর, ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
হামের সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেড়েই চলেছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সরকারি তথ্যেই হাম ও উপসর্গে প্রাণ গেছে ৪০৯ শিশুর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতে আর দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।
তারা বলেছেন, সারা বিশ্বেই হাম বেড়েছে, তবে বাংলাদেশের মতো এত শিশুর মৃত্যু কোথাও হয়নি। বিশেষজ্ঞরা হামের এই প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে শিশুকে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিড না করানো, সময়মতো টিকা না দেওয়া, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন না হওয়া, পুষ্টিহীনতা এবং সর্বোপরি শিশুর রোগ প্রতিরোধে ঘাটতিকে দায়ী করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, নিশ্চিত হামে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৬৫ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে এ পর্যন্ত ৩৪৪ জনের। হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৯ হাজার ১৫৯ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৪ হাজার ৯০৯ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ৩০ হাজার ৮৬২ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮১৯ জন।
এদিকে, অতিসংক্রামক হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া শিশুর প্রত্যেক পরিবারকে ২ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দেশের প্রত্যেক জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষাসুবিধাসহ হাম চিকিৎসার বিশেষায়িত ইউনিট স্থাপনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।
এ ছাড়াও হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) ইউনিসেফ, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। রিটে প্রাথমিক শুনানির পর আদালত এই নির্দেশনা দিলে কমিটি যেন ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে, সে নির্দেশনাও চেয়েছেন রিটকারীরা।
একই সঙ্গে হামের পাশাপাশি দেশে জলাতঙ্ক রোগের অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন বা টিকার মজুত, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্য সাত দিনের মধ্যে আদালতে দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব, মোহামমদ কাউছার, মো. মাকসুদুর রহমান গতকাল জনস্বার্থে এ রিট করেন। রিটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও আইইডিসিআরের পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে।
আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ৫ মে বিবাদীদের আইনি নোটিস পাঠিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু নোটিসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা এবং হাম পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আদালতের অনুমতি নিয়ে জনস্বার্থে রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়।’
বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর দ্বৈত বেঞ্চে সোমবার (১১ মে) রিটটিতে শুনানি হতে পারে বলে জানিয়েছেন এই আইনজীবী।
রিটে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সারা দেশে হাজার হাজার শিশু এখনো আক্রান্ত। পরিস্থিতি এমন যে, হামের এই প্রাদুর্ভাব গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।
এতগুলো শিশুর মৃত্যু আকস্মিক কোনো ঘটনা নয় উল্লেখ করে রিটে আরও বলা হয়েছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নীতিগত পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের কার্যকর ব্যবস্থার ব্যত্যয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা উপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাবেই এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নিলে টিকা সরবরাহ ও টিকাদান কর্মসূচিতে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
ইউনিসেফ একাধিকবার সম্ভাব্য টিকা সংকট, হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে সতর্ক করলেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে রিটে।
