×

জাতীয়

২৩২ কোটি টাকার মুহুরী সেচ প্রকল্পে মিলছে না সুফল

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম

২৩২ কোটি টাকার মুহুরী সেচ প্রকল্পে মিলছে না সুফল

ছবি : সংগৃহীত

ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি উত্তোলন এবং পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার, মিটার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরির ঘটনায় সম্ভাবনাময় মুহুরী সেচ প্রকল্পটি এখন হুমকির মুখে। চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনী জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুনে ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হলেও এখনো এর প্রত্যাশিত সুফল ঘরে তুলতে পারছেন না স্থানীয় কৃষকরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ১৭ জুন ‘ইরিগেশন ম্যানেজমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আইএমআইপি)’ একনেকে অনুমোদন পায়। সরকারের অনুদান এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ সহায়তায় প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কাজ শুরু হলেও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে প্রায় দুই বছর কাজ বন্ধ থাকে। নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৮ হাজার হেক্টর জমিকে সেচের আওতায় আনা। এর জন্য ৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপন, প্রিপেইড মিটারিং সিস্টেম, সার্ভারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক পাম্পের মাধ্যমে ৮৫০টি স্কিম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত চালু হয়েছে মাত্র ৩৩৮টি স্কিম এবং সেচের আওতায় এসেছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।

প্রকল্পটির কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ২০২৪ সালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায়। আগস্ট মাসে ফেনী ও আশপাশের এলাকায় হঠাৎ বন্যা দেখা দিলে মুহুরী নদীসহ বিভিন্ন নদীর অন্তত ৯৬টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যায়। এতে পুরো প্রকল্প এলাকা ১২ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে থাকে। কোথাও কোথাও পানির গভীরতা ১০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এই দীর্ঘস্থায়ী প্লাবনে প্রকল্পের আধুনিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিকাংশ মোটর পাম্প, ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন, প্রিপেইড মিটার, বৈদ্যুতিক বোর্ড এবং সার্ভার সিস্টেম অকেজো হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত স্কিমগুলো পুনর্বাসনের জন্য অন্তত ২০ কোটি টাকার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে গুণগত মান বজায় রেখেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়। কাজ শেষে পরামর্শক, বিভাগীয় দপ্তর ও ঠিকাদার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে স্কিমগুলো কমিশনিং করে স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধি ও পাম্প অপারেটরদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহল ও চাঁদাবাজদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে।

প্রকল্প চলাকালে একাধিকবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও বিভিন্ন তদন্তে সেগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার বা অতিরিক্ত দামে কাজ নেওয়ার অভিযোগের তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি। এমনকি ট্রান্সফরমার চুরির অভিযোগের ক্ষেত্রেও তদন্তে দেখা যায়, নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এবং চুরি হওয়া সরঞ্জাম ঠিকাদারের বীমার আওতায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক (বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী-পুর) মো. রাফিউস সাজ্জাদ বলেন, শুরু থেকেই একটি চক্র প্রকল্পটিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। বন্যার ক্ষতির পাশাপাশি অবৈধ মাটি কাটা এবং ট্রান্সফরমার চোরচক্র পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তার মতে, একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকল্পটিকে ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় একটি সাবস্টেশনসহ ২৩৮ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ওপর ন্যস্ত। পাশাপাশি স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা সংগঠনগুলোর ওপর স্কিমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ছোটখাটো মেরামতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব পক্ষ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করলে প্রকল্পটি আবার সচল করা সম্ভব।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। স্থানীয় অনেক কৃষক এখনো সেচ ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে আগ্রহী নন। তারা বরং কম ঝুঁকিপূর্ণ রবি শস্যের দিকে ঝুঁকছেন। এতে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এদিকে, ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উর্বর উপরের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়ার ফলে অনেক জায়গায় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক মিটার ও তার চুরির ঘটনাও প্রকল্প পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক স্কিম চালু থাকলেও নিয়মিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আধুনিক ও জটিল সেচ প্রকল্প থেকে পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে অন্তত পাঁচ বছর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা ছাড়া প্রকল্পটি সফল করা কঠিন হবে।

উল্লেখ্য, প্রকল্পটির কাজ ও মান নিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচবার তদন্ত করা হয়েছে, তবে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এটি একটি পাইলট প্রকল্প হওয়ায় এর সফলতা ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, সম্ভাবনাময় মুহুরী সেচ প্রকল্পটি এখন একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে মানবসৃষ্ট সমস্যা—এই দ্বৈত চাপে বিপর্যস্ত। যথাযথ উদ্যোগ, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি আবারও কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

গৃহবধূ শিমু হত্যা, গ্রেপ্তার ৩

গৃহবধূ শিমু হত্যা, গ্রেপ্তার ৩

কর্মস্থল থেকে বের হয়ে নিখোঁজ, ১১ দিনেও সন্ধান নেই

সিরাজদিখান কর্মস্থল থেকে বের হয়ে নিখোঁজ, ১১ দিনেও সন্ধান নেই

জেলেদের চাল কম দেওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি

জেলেদের চাল কম দেওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি

ফলন ভালো ক্রেতা নেই, হতাশায় মাশরুম চাষীরা

ফলন ভালো ক্রেতা নেই, হতাশায় মাশরুম চাষীরা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App