×

অন্যান্য

জিম মরিসন যেন ক্ষনস্থায়ী আগুনের নাম

Icon

মো: মনজুর আহমেদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

জিম মরিসন যেন ক্ষনস্থায়ী আগুনের নাম

ছবি: জিম মরিসনের শেষ ফটোগ্রাফ এটি, ১৯৭১ সালের ২৮ জুন তোলা

আচ্ছা, জিম মরিসনকে কি আগুনের সাথে তুলনা করলে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে? আগুন তো উজ্জ্বল, উষ্ণ, বিপজ্জনক এবং ক্ষণস্থায়ী। তবে আগুন নিভে গেলেও তার আলো অনেক দূর থেকেও দেখা যায়।

জিম মরিসনের আলোও তেমনি আজও রক সঙ্গীত, কবিতা এবং সংস্কৃতির আকাশে জ্বলজ্বল করছে। তাঁর লেখা এবং গাওয়া আজও উষ্ণতা ছড়ায়, বিপদজনক ভাবে বিমোহিত করে শ্রোতাদের। আর মাত্র ২৭ বছর বয়সের ছোট্ট জীবন তো ক্ষনস্থায়ী আগুনের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

সারা বিশ্বে  রক সংগীতের  ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উপস্থিতি শুধু সংগীতের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তারা হয়ে উঠেছেন সময়ের প্রতীক,পজন্ম থেকে প্রজন্মের কণ্ঠস্বর। জিম মরিসন সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি ছিলেন গায়ক, গীতিকার , কবি, মঞ্চের নায়ক এবং একই সঙ্গে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহের প্রতীক। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর কবিতাময় গীতরচনা, মঞ্চে তাঁর ব্যক্তিত্বপুর্ন উপস্থিতি এবং তাঁর অকালমৃত্যু, এই সব মিলিয়ে তিনি আজও এক রহস্যময় কিংবদন্তি।

জেমস ডগলাস মরিসন, যিনি পৃথিবীর কাছে জিম মরিসন নামে পরিচিত। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ৮ ডিসেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মেলবোর্ন শহরে। তাঁর শৈশব ছিল কিছুটা অস্থির, কারণ তাঁর বাবা ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। ফলে পরিবারকে প্রায়ই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হতো। এই ঘন ঘন স্থানান্তর তাঁর মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও আত্মমগ্নতা তৈরি করে। ছোটবেলা থেকেই তিনি বই পড়তে ভালোবাসতেন। দর্শন, সাহিত্য, পৌরাণিক কাহিনি এবং কবিতা তাঁর প্রিয় বিষয়, আর  উইলিয়াম ব্লেক, আর্তুর র্যাঁবো, ফ্রিডরিখ নীটশে এবং জ্যাক কেরুয়াক ছিলো  তাঁর পছন্দের লেখক।

পরবর্তীতে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেস এ চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় রে ম্যানজারেকের সঙ্গে। একদিন সমুদ্রসৈকতে মরিসন তাঁর লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করলে ম্যানজারেক এতটাই মুগ্ধ হন যে, তাঁরা একসঙ্গে একটি ব্যান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৫ সালে জন্ম নেয় ‘দ্য ডোরস’। ব্যান্ডটির নাম নেওয়া হয় অ্যালডাস হাক্সলির বিখ্যাত গ্রন্থ The Doors of Perception থেকে, যা আবার উইলিয়াম ব্লেকের একটি উক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত।

দ্য ডোরস খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমেরিকান রক সঙ্গীতে এক বিপ্লব ঘটায়। তাদের সংগীতে ছিল ব্লুজ, সাইকেডেলিক রক, জ্যাজ এবং পরীক্ষামূলক সুরের অনন্য মিশ্রণ। কিন্তু ব্যান্ডটির আসল আকর্ষণ ছিলেন জিম মরিসন। তাঁর গভীর, আবেশময় কণ্ঠ, মঞ্চে তাঁর সম্মোহনী উপস্থিতি এবং তাঁর গানের কথা শ্রোতাদের মোহিত করত। ‘Light My Fire’, ‘Break on Through’, ‘The End’, ‘People Are Strange’ এবং ‘Riders on the Storm’ এসব গান শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বরং রক সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছে।

মরিসনের গানের কথা ছিল প্রচলিত রক গানের তুলনায় অনেক বেশি গভীর, দার্শনিক এবং প্রতীকসমৃদ্ধ। তিনি প্রেম, মৃত্যু, স্বাধীনতা, অস্তিত্ব, ভয়, কামনা এবং মানুষের অবচেতন মন নিয়ে লিখতেন। তাঁর গান শুনলে মনে হয় যেন একজন কবি সুরের মাধ্যমে আত্মার গভীরে প্রবেশ করছেন। এ কারণেই তাঁকে অনেকেই ‘রক কবি’ বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর বিখ্যাত উপাধি ‘দ্য লিজার্ড কিং’ তাঁর রহস্যময় ও বন্য শিল্পীসত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

মঞ্চে জিম মরিসন ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা এক সত্তা। তিনি কখনও কোমল, কখনও উন্মত্ত, কখনও দার্শনিক, আবার কখনও বিদ্রোহী। তাঁর পরিবেশনা ছিল অননুমেয়, নাটকীয় এবং প্রায়ই বিতর্কিত। তিনি দর্শকদের সঙ্গে এক ধরনের মানসিক সংযোগ স্থাপন করতেন।

১৯৬৭ সালে The Ed Sullivan Show-তে The Doors-এর পারফর্ম করার সুযোগ হয়। এই শো-টি তখন আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠানগুলোর একটি ছিল। তারা Light My Fire গানটি গাইবে কিন্তু শো কর্তৃপক্ষ মরিসনকে একটি লাইন পরিবর্তন করতে বলে।

মূল লাইন ছিল- Girl, we couldn’t get much highe, যা নেশার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছিল।

কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল তিনি যেন ‘higher’ শব্দটি না বলেন। মরিসন সম্মত হয়েছিলেন, অন্তত বাইরে থেকে। কিন্তু লাইভ পারফরম্যান্সে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ঠিক আগের মতোই ‘higher’ গেয়ে দেন! ফলাফল?

শো কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে যায়, ব্যান্ডটিকে ভবিষ্যতে আর কখনো সেই শো-তে ডাকেনি। কিন্তু মরিসনের “বিদ্রোহী” ইমেজ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই ঘটনাটিতে দেখা যায় তিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে নিজের স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

আর একবার, ১৯৬৯ সালে মিয়ামির এক কনসার্টে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অশালীন আচরণ’-এর অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। যদিও অনেকেই বলেন ঘটনাটি অতিরঞ্জিত ছিল, তবুও এটি তাঁর ক্যারিয়ারে বড় প্রভাব ফেলে।

তবে জিম মরিসনের জীবন শুধু সাফল্য ও জনপ্রিয়তার গল্প নয়। খ্যাতির চাপ, ব্যক্তিগত অস্থিরতা এবং মদ্যপানের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে তাঁকে গ্রাস করতে থাকে। তিনি সবসময় নিজেকে মূলত একজন কবি হিসেবে দেখতে চাইতেন। রক তারকার পরিচয় তাঁকে যেমন বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দিয়েছিল, তেমনি তা তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছিল। তিনি বারবার চেষ্টা করেছেন নিজের অন্তর্গত কবিকে খুঁজে পেতে।

১৯৭১ সালে, দ্য ডোরসের বিখ্যাত অ্যালবাম L.A. Woman প্রকাশের পর, মরিসন ক্লান্ত হয়ে পড়েন খ্যাতি ও বিতর্কে। তিনি প্যারিসে চলে যান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কিছুটা নির্জনে থাকা, লেখা,  নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা এবং তাঁর প্রেমিকা পামেলা কোরসনের সঙ্গে একটু শান্তিতে থাকার জন্য। ৩ জুলাই, ১৯৭১,

প্যারিসের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। সরকারি হিসেবে বলা হয় হার্ট অ্যাটাক (হৃদরোগে মৃত্যু) এ মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এখানেই শুরু রহস্য, কোনো অটোপসি (ময়নাতদন্ত) করা হয়নি। মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়ে সন্দেহ রয়ে যায়।

অনেকে মনে করেন ড্রাগ ওভারডোজ হতে পারে,

আবার কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে, তিনি নাকি আসলে মারা যাননি! আরও একটি প্রচলিত গল্প হলো, তিনি নাকি একটি নাইটক্লাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, পরে বাসায় আনা হয়। তবে এগুলোর বেশিরভাগই প্রমাণহীন বা অনুমাননির্ভর। মাত্র ২৭ বছরে তাঁর অকালপ্রয়াণ তাঁকে তথাকথিত ‘২৭ ক্লাব’ এর অন্যতম বিখ্যাত সদস্যে পরিণত করে। মরিসনকে সমাহিত করা হয় প্যারিসের বিখ্যাত Père Lachaise Cemetery এ। আজও এটি তাঁর ভক্তদের জন্য তীর্থস্থানের মতো। প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে যায়।

জিম মরিসন শুধু একজন গায়ক নন, তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক আইকন। তাঁর জীবন ছিল স্বাধীনতার সন্ধান, আত্ম-অনুসন্ধান এবং সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তিনি দেখিয়েছেন, সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়; এটি হতে পারে চিন্তার, প্রশ্নের এবং আত্মপ্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম।

আজও জিম মরিসনের গান নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে। তাঁর কবিতা, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে সত্যিকারের শিল্পী কখনও সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেন না। তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও আমাদের ভাবায়, আলোড়িত করে এবং অনুপ্রাণিত করে। তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো কখনো মজার, কখনো বিতর্কিত, আর তাঁর মৃত্যু আজও এক অমীমাংসিত ধাঁধা।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে কাজ করছে সরকার

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে কাজ করছে সরকার

জলাবদ্ধতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বৃদ্ধার মৃত্যু

জলাবদ্ধতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বৃদ্ধার মৃত্যু

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি তরুণদের

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি তরুণদের

রবীন্দ্র কুঠিবাড়িকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে

নিতাই রায় চৌধুরী রবীন্দ্র কুঠিবাড়িকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App