সড়কে মৃত্যুপুরী: অরাজকতার শিকড় কোথায়, সমাধান কী?
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০ পিএম
সড়কে মৃত্যুপুরী: অরাজকতার শিকড় কোথায়, সমাধান কী?
প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘোরে, দিন শেষে কি নিরাপদে ফিরে আসতে পারব? এই প্রশ্ন কোনো কল্পিত ভয় নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
বাংলাদেশের সড়কপথ আজ আর কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, অনেকের কাছে তা পরিণত হয়েছে অনিশ্চিত জীবনের প্রতীক, এমনকি মৃত্যুপুরীতে।
দেশের জাতীয় মহাসড়ক থেকে শুরু করে জেলা সড়ক, শহরের ব্যস্ত মোড় থেকে গ্রামীণ পথ- সবখানেই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা একই রকম। বাস টার্মিনালগুলোতে বিশৃঙ্খলা, সড়কে বেপরোয়া গতি, লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন- সব মিলিয়ে পুরো পরিবহন খাত যেন এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবস্থার মধ্যে চলছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি এখন একটি কাঠামোগত সংকট।
বাংলা নববর্ষের দিনেও কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ট্রাক খাদে পড়ে সাতজন ধান-কাটা শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে সাম্প্রতিক ঈদযাত্রা ঘিরে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয় আবারও জাতীয় উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছিল। জাতীয় সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। কঠোর নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য। তাই সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; আমাদের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তবে আমাদের জাতীয় সংকট এখন আর দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের মহাসড়কে বেপরোয়া বাস চালানোর দৃশ্য আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এখন নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।
বিশ্বে প্রতিবছর সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারায় প্রায় ১২ লাখ মানুষ। এ পরিসংখ্যানে এগিয়ে আছে গিনি, লিবিয়া, হাইতি, সিরিয়ার মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। তবে এ তালিকায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ।
২০২৫ সালে দেশে সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৯হাজার১১১ জন। আহত হয় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। ২০২৪ সালে প্রাণ হারায় ৮ হাজার ৫৪৩ জন।
পরিসংখ্যান যে ভয়াবহ বাস্তবতার কথা বলে- গত মার্চ মাসে দেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত ও ২ হাজার ২২১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ৬৬ জন এবং শিশু ৯৮ জন। মোট প্রাণহানির মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি যেখানে ২০৪ জন নিহত হয়েছেন যা মোট মৃত্যুর ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এছাড়া যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির ২৮ দিনে দেশে ৪৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ৪৪৭ জন, আহত হয়েছে ১,১৮১ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ জন মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে।
এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৪১.৭৪ শতাংশ ক্ষেত্রে বেপরোয়া গতির যানবাহন পথচারীকে চাপা দিয়েছে। ৩৩.২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে মুখোমুখি সংঘর্ষ, আর ১৭.১৮ শতাংশ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়েছে যানবাহন। এসব তথ্য স্পষ্ট করে দেয়,সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে চালকের আচরণ ও নিয়ন্ত্রণহীন গতি।
এছাড়া দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে জাতীয় মহাসড়কে (৪২.৬৩ শতাংশ)। এরপর রয়েছে আঞ্চলিক মহাসড়ক (২৫.৪৪ শতাংশ) এবং ফিডার রোড (২৭ শতাংশ)। এমনকি রাজধানী ঢাকাও নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশে একটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পর যে চিত্রটি দেখা যায়, তা আরও উদ্বেগজনক। শুরু হয় দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা। চালক দোষ দেন পথচারীকে, পথচারী দোষ দেন চালককে। পুলিশ দায় চাপায় বিআরটিএর ওপর, বিআরটিএ পাল্টা অভিযোগ তোলে পুলিশের বিরুদ্ধে। বাস মালিকরা দায় চাপান সরকারের ওপর।
এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতির ফলে প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিচারহীনতার এই চক্রই মূলত সড়ক খাতে অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো অদৃশ্য সিন্ডিকেট। দেশের প্রায় প্রতিটি বাস টার্মিনাল, স্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চাঁদাবাজির এক অঘোষিত ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা এই খাত থেকে সংগ্রহ করা হয়, যার বড় অংশ যায় প্রভাবশালী মহলের কাছে।
এই অর্থনৈতিক শক্তিই পরিবহন খাতের কিছু গোষ্ঠীকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। ফলে কোনো চালক বা শ্রমিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই হঠাৎ করে ডাকা হয় ধর্মঘট, যার ফলে সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে জিম্মি।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের আইন যেন অনেক সময়ই অসহায় হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অদক্ষ চালক। দেশে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে চালকদের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন।
পরিকল্পনা ছিল পাঁচ বছরে তিন লাখ দক্ষ ভারী যানবাহনের চালক তৈরি করা হবে। এই লক্ষ্যে একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই প্রকল্প সাত বছর ধরে ফাইলবন্দি।
এদিকে দেশে বর্তমানে প্রায় ১,৬৫০ জন প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক থাকলেও তাদের বড় অংশ কার্যত নিষ্ক্রিয়।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়ন নেই।
ফলে অদক্ষ চালকের সংখ্যা কমার বদলে বাড়ছে, যা সরাসরি দুর্ঘটনার হার বাড়াচ্ছে।
পরিবহন শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানও এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অধিকাংশ চালক ও সহকারী কোনো স্থায়ী নিয়োগপত্র ছাড়া কাজ করেন। তাদের আয় নির্ভর করে ট্রিপের ওপর।
ফলে বেশি আয় করার জন্য তারা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান,প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের অভাবে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে ক্লান্তি দূর করতে তারা মাদক গ্রহণ করেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সরকারিভাবে ‘ডোপ টেস্ট’ চালুর ঘোষণা থাকলেও তার বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন আছে, নীতিমালা আছে, এমনকি কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো,এই আইনগুলোর প্রয়োগ।
আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ না থাকলে কোনো আইনই কার্যকর হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। ফলে অপরাধীরা শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যায়।
এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালকদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি করেছে,যা সড়কে আরও বেপরোয়া আচরণের জন্ম দেয়।
সরকার সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে,এমন দাবি প্রায়ই শোনা যায়। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, নতুন আইন, নজরদারি বৃদ্ধি,সবই পরিকল্পনার অংশ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব উদ্যোগের অনেকই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বড় বড় প্রকল্প বছরের পর বছর অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে থাকে। আবার অনুমোদন পেলেও বাস্তবায়নে গতি থাকে না।
ফলে সমস্যার মূল জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসে না।
সড়ক দুর্ঘটনার এই মহামারি থেকে মুক্তি পেতে হলে খণ্ডকালীন নয়, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রথমত, আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের কাছে আইন জিম্মি থাকতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ফাইলবন্দি প্রকল্পগুলো দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশিক্ষকদের কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। এটি না হলে কোনো সংস্কারই স্থায়ী হবে না।
চতুর্থত, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে হবে। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
পঞ্চমত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্পিড ক্যামেরা, অটোমেটেড ফিটনেস চেক, ডিজিটাল লাইসেন্সিং,এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব।
শেষকথা হলো, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না, মানুষের নিরাপত্তা তার অন্যতম প্রধান সূচক। সড়কে যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থা আজ একটি সংকটের মুখোমুখি। এটি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। প্রতিদিনের এই মৃত্যু মেনে নেওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তবে এখনই সময় কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অন্যথায়, প্রতিদিনের এই মৃত্যু মিছিল চলতেই থাকবে,আর আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাবো শোকের সঙ্গে বেঁচে থাকতে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
