পুত্র সহজকে লেখা রাহুলের শেষ চিঠি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
ছেলে সহজের সঙ্গে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি : সংগৃহীত
টালিউডের প্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল প্রয়াণ বাংলা বিনোদন জগতে এক শোকের ছায়া ফেলেছে। রবিবার (২৯ মার্চ) ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন ৪২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই অভিনেতার সিনেমায় আগমনের আগে ছোট পর্দায় নিজের মাটি শক্ত করেছিলেন। জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘খেলা’তে আদিত্যর চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছিল।
কিন্তু ২০০৮ সালে রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনি তুমি যে আমার’ ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকারের বিপরীতে তাঁর অভিনয় রাতারাতি তাকে সুপারস্টারের তকমা এনে দেয়। এরপর ‘জ্যাকপট’, ‘লভ সার্কাস’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, ‘পতি পরমেশ্বর’-এর মতো একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
নাটক ও টেলিভিশনের পর্দাতেও রাহুল অসাধারণ প্রতিভা দেখিয়েছেন। ‘দেশের মাটি’ ধারাবাহিকে রাজা চরিত্র এখনও দর্শকদের মনে অম্লান। তাঁর শেষ অভিনীত ছবি ছিল ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ এবং ‘রাপ্পা রায় ও ফুলস্টপ ডট কম’। নাটকের মঞ্চ ও পডকাস্টেও তিনি বিনোদনের নানা দিক তুলে ধরতেন।
পুত্র সহজকে লেখা একটি আবেগঘন চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে। চিঠিতে তিনি সহজকে তার জন্ম, মায়ের সংগ্রাম এবং বাংলা ভাষার প্রতি প্রেমের শিক্ষার কথা জানিয়েছেন। রাহুল লিখেছেন, এই চিঠিটা আজকে ‘ফাদারস ডে’ বলে লিখতে বসা। যদিও তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও ‘ফাদারস ডে’, ‘মাদারস ডে’— এ গুলো আলাদা করে জানত না, কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এ সব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত।
আরো পড়ুন : অরুণোদয় থেকে রাহুল হয়ে ওঠার এক অসম্পূর্ণ রূপকথা
তিনি লিখেছেন, জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু যখন তোমার মায়ের ১৪ বছর বয়স ছিল, আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। যে হেতু ছোট, তাই অন্যদের ছেড়ে শেষে আমাদের শট নেওয়া হতো। আর আমরা দু’জন সেটের কোনায় বসে আড্ডা মেরে যেতাম। তোমার মা ছিল বেহালার একজন অ্যাকাউন্টস শিক্ষকের মেয়ে আর আমি খুব সাধারণ এক সরকারি চাকুরের ছেলে। আমরা দু’জন এই ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে। তোমাকে এই গল্প কেন বলছি জানো? যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তা হলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড, যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে— ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা মা। এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করব প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও। কারণ যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন। উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, এটুকু আশা তো করতেই পারি, কী বলো?
রাহুল তার ছেলেকে লেখেন, যে দিন আমরা প্রথম খবর পাই, তুমি আমাদের জীবনে আসছো, আমরা আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম জানো? তোমার মা গুচ্ছের সব অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলল। রোজ আমাকে আপডেট দিত, ‘এখন ওর সাইজ আপেলের মতো’, ‘এখন ওর সাইজ আনারসের মতো’, আরো কত কী! তার পর যখন তুমি হলে, তোমার মায়ের আর একটা রূপ দেখলাম। তুমি জানো না হয়তো, তোমার মা তোমাকে কোনও দিন বাজার চলতি বেবিফুড কিনে খাওয়ায়নি। সব নিজের হাতে বানাত। তাতে যদি সারা দিন লাগে, তো লাগুক। তোমার মায়ের তোমার জন্য অনেক সংগ্রাম, অনেক আত্মত্যাগ। তুমি কতটা মনে রাখবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত। আজ তোমার মা ইনস্টাগ্রামে যথেষ্ট এস্থেটিক ছবি দেওয়ার পরেও উড়ো কমেন্ট ভেসে আসে ‘লজ্জা করে না আপনার? আপনি কিনা মা?’ না, এ নিয়ে কোনও দুঃখবোধ আছে ভেবো না, গন্ডারের চামড়া ধার নিয়ে তবে সেলিব্রিটি হওয়া যায়, এ আমরা শিখে গেছি। শুধু তোমাকে বলছি, তোমার মায়ের লড়াইয়ের একটা আন্দাজ দেওয়ার জন্য। আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মাও রেখেছে। কিন্তু আমি চাইব, তুমি সেই ক্ষতগুলোর শুশ্রূষা করবে। মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে নাও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে।
রাহুল লেখেন, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কোন হরিদাস পাল যে তোমাকে এত জ্ঞান দিচ্ছে? আমি তোর বাপ (হাঃ হাঃ), দূর সম্পর্কেরই হই, বাপ তো বটে! সেই উপলক্ষে একটু জ্ঞান দেওয়ার অধিকার জন্মে যায়ই। আমি তোমাকে আমার ভাগের সব ক'টা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো এর পর থেকে। আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম।
রাহুল লিখেছেন, সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার বলে আমি জানি। শুধু তোমার একটা প্রশ্নের উত্তর ছাড়া। তখন তুমি সদ্য মায়ের সঙ্গে আলাদা হয়েছ। প্রায় এক বছর পর তুমি আমাদের বেডরুমে ঢুকে এদিক ওদিক দেখে আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, ‘আমি এই ঘরে থাকতাম না বাবা?’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম - হ্যাঁ। তুমি প্রশ্ন করেছিলে – ‘তার পর কী হল? এখন আর থাকি না কেন?’ বিশ্বাস করো, সেই প্রশ্নের উত্তর সে দিনও ছিল না, আজও নেই। ক্ষমা করো।
- বাবা"
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই চিঠি তার সন্তান সহজের প্রতি অবিরাম ভালোবাসা, অনুভূতি ও জীবনের শিক্ষা দিয়ে ভরা। এই আবেগঘন বার্তায় দেখা যায়, তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, বরং পিতা হিসেবে ও মানবিক আদর্শের শিক্ষা দানকারী ছিলেন।
