বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের ‘ভীতিকর’ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কড়া সমালোচনা উইজডেনের
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
উইজডেনের তোপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড
বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য এবং খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতির সংমিশ্রণ নিয়ে নজিরবিহীন সমালোচনা করেছে ক্রিকেটের বাইবেল খ্যাত প্রকাশনা ‘উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক’। ১৮৬৪ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত এই সংকলনের ১৬৩তম সংস্করণে বর্তমান ক্রিকেট ব্যবস্থাকে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ ও ‘বিষাক্ত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অ্যালমানাকের সম্পাদক লরেন্স বুথ সতর্ক করে বলেছেন, ক্রিকেটের বর্তমান ধারা খেলাটির দীর্ঘমেয়াদী ভারসাম্য ও নিরপেক্ষতাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
উইজডেন সম্পাদক লরেন্স বুথ তার সম্পাদকীয়তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) শীর্ষ নেতৃত্বে ভারতীয় প্রভাবের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ এবং প্রধান নির্বাহী সংযোগ গুপ্ত—উভয়েই ভারতীয় হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বুথ প্রশ্ন তুলেছেন সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে।
বিশেষ করে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পুত্র জয় শাহর রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কারণে বিসিসিআই কার্যত ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একটি ‘ক্রীড়া শাখা’ হিসেবে কাজ করছে বলে উইজডেনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের এশিয়া কাপকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা কীভাবে মাঠের সৌজন্যবোধকেও নষ্ট করেছে, তার উদাহরণ টেনেছেন বুথ। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের পর ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের জয়টি সশস্ত্র বাহিনীকে উৎসর্গ করা এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী মোদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই জয়কে ‘অপারেশন সিঁদুর’ এর সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় বার্তার নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছে উইজডেন। বুথ পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভির দাবি নিয়েও। নকভি যখন বলেন খেলাধুলা ও রাজনীতি আলাদা, তখন বুথ মনে করিয়ে দেন যে একই ব্যক্তি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন এই বিভাজন কতটা হাস্যকর।
উইজডেনের এই সংস্করণে বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৬ সালের আইপিএল নিলামে ৯.২ কোটি রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দলে নিলেও বিসিসিআইয়ের নির্দেশে আকস্মিকভাবে তাকে ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
বুথের মতে, এটি কেবল ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নেয়া এক ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ। এই ঘটনার রেশ ধরে বিসিবি তাদের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে সরানোর প্রস্তাব দিলেও আইসিসি তা নাকচ করে দেয়। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুথ আইসিসির দ্বৈত নীতির সমালোচনা করে বলেন, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত পাকিস্তানে খেলতে যেতে রাজি না হওয়ায় আইসিসি দ্রুত নিরপেক্ষ ভেন্যুর ব্যবস্থা করে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়, যা তার মতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রশাসনে দ্বৈত নীতির ইঙ্গিত দেয়।
সম্পাদকীয়র শেষে লরেন্স বুথ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, বিশ্ব ক্রিকেটের শাসনব্যবস্থা এখন জর্জ অরওয়েলের উপন্যাসের মতো ‘অরওয়েলিয়ান’ রূপ ধারণ করেছে। এখানে ক্ষমতাধরদের অন্যায্য সুবিধাকেই স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হচ্ছে এবং কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো তাকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। বুথের ভাষায়, ক্রিকেট আগেও রাজনীতির বাইরে ছিল না, কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো এত বেশি ‘বিষাক্ত’ ও ‘বিভক্ত’ পরিবেশ ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি।
