বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
টিকার ঘাটতিতে বাংলাদেশে হামের উচ্চ ঝুঁকি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি দেশটিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুল শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, টিকাদানে ঘাটতি রয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে—এসব কারণেই এই ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (আইএইচআর) ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-কে জানায়, দেশে হামের রোগী উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকেই এই ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট।
সংস্থাটির সাবেক পরামর্শক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সংক্রমণ বাড়তে থাকায় আগেই হামের জন্য জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এখন দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ জনের বেশি। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের। এই সময়ে ১২ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা গেছে ঢাকা বিভাগে। এখানে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি। এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায়—বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও অঞ্চলে রোগীর সংখ্যা বেশি।
দেশের আটটি বিভাগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রায় ৯১ শতাংশ জেলায় রোগী পাওয়া গেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়। টিকাদান কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যেও অধিকাংশই শিশু। পাঁচ বছরের কম বয়সীদের হার প্রায় ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী ৬৬ শতাংশ এবং নয় মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ। সন্দেহভাজন মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের বড় কারণ টিকাদানে ঘাটতি। অনেক শিশু টিকা পায়নি বা মাত্র এক ডোজ নিয়েছে। আবার কিছু শিশু টিকার উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাস ও সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের ৭ থেকে ২৩ দিনের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং মুখে সাদা দাগের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে, যা মাথা থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
রোগটি সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহে সেরে গেলেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ, অন্ধত্বসহ গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। প্রতি হাজার রোগীর মধ্যে ২ থেকে ৩ জনের মৃত্যু হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, অতীতে বাংলাদেশ হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এমআর টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন এবং সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির অভাবে সেই অগ্রগতিতে ধাক্কা লেগেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ভিটামিন এ সরবরাহ, রোগী ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, নজরদারি জোরদার এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল সক্রিয় করা হয়েছে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচল এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের কারণে সংক্রমণ দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত সংযোগ এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্থাটি টিকাদানের কভারেজ কমপক্ষে ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
সার্বিকভাবে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
