‘ঐতিহাসিক সত্য মেনে নিতে দ্বিধাচিত্তে থাকা হীনমন্যতার পরিচায়ক’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ঐতিহাসিক সত্য মেনে নিতে দ্বিধাচিত্তে থাকা হীনমন্যতার পরিচায়ক। আর তাই হীন দলীয় স্বার্থে আমাদের ইতিহাসের জাতীয় নেতাদের ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে কার্পণ্য করি, তাহলে ভবিষ্যতের ইতিহাস আমাদেরকেও ক্ষমা করবে না।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ, যুদ্ধাহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধে প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।’
স্বাধীনতা পুরস্কারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা দেশ এবং জনগণের জন্য স্মরণীয় অবদান রেখেছেন, তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলেন।’
চলতি বছর স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক এবং ৫টি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নারী শিক্ষাসহ দেশ গঠনে অসামান্য অবদানের জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে এ বছর মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।’
ইতিহাসের সত্যতা স্বীকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি হীন দলীয় স্বার্থে আমাদের ইতিহাসের জাতীয় নেতাদের ভূমিকাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে কার্পণ্য করি, তাহলে ভবিষ্যতের ইতিহাস আমাদেরকেও ক্ষমা করবে না। আমি বিশ্বাস করি, ঐতিহাসিক সত্য মেনে নিতে দ্বিধাচিত্তে থাকা হীনমন্যতার পরিচায়ক।’
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। আমাদের পথ, মত ভিন্ন হতে পারে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক-বিরোধ থাকতে পারে, তবে তা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। কারণ বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চক্র এখনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।’
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘দুর্নীতি, দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসনকাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।’
শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে এসেছিল। এমনকি ইন্টেরিম গভর্মেন্টের সময়ও শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফেরেনি। বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করতেই হবে এবং আমরা সেই কাজ শুরু করেছি।’
এ ছাড়া নারীদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপরও প্রধানমন্ত্রী জোর দেন।
নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা প্রকাশ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য স্বাক্ষর করেছিলাম। আমরা দলীয় ইশতেহার এবং স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব ইনশাল্লাহ।’
বৈশ্বিক সংকট ও অর্থনীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি সরকার যতবার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে, বারবার চেষ্টা করেছে প্রমাণ দিতে যে, ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে মানসিকতার পরিবর্তন বেশি জরুরি। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। বিশ্বের সব দেশে তেল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হলেও জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে আমরা তা করিনি। প্রতিদিন শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে হলেও সরকার আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।’
বর্তমান সরকারকে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত ও দায়বদ্ধ সরকার উল্লেখ করে তিনি দেশবাসীকে বিচলিত না হওয়ার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাহুল্যতা বর্জন এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে অমিতব্যয়িতা পরিহার করার অনুরোধ করেন তিনি।
পরিশেষে পদকপ্রাপ্ত গুণীজন ও প্রতিষ্ঠানকে দেশ ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে এবং মরণোত্তর পুরস্কারপ্রাপ্তদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন।
এর আগে দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ৫ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের এই পদক প্রদান করা হয়।
এ বছর স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, নারী শিক্ষাসহ দেশগঠনে সার্বিক অবদানের জন্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার পক্ষে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করেন নাতনি জাইমা রহমান।
স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত অন্য ১৪ ব্যক্তি হলেন- মুক্তিযুদ্ধে মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিল (মরণোত্তর), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জহুরুল করিম, সাহিত্যে আশরাফ সিদ্দিকী (মরণোত্তর), সংস্কৃতিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র উপস্থাপক এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত), বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী বশীর আহমেদ (মরণোত্তর), ক্রীড়ায় দেশের টেবিল টেনিসের কিংবদন্তি জোবেরা রহমান (লিনু), সমাজসেবায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী (মরণোত্তর), মো. সাইদুল হক, রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী (মরণোত্তর), জনপ্রশাসনে কাজী ফজলুর রহমান (মরণোত্তর), গবেষণা ও প্রশিক্ষণে মোহাম্মদ আবদুল বাকী, অধ্যাপক এম এ রহিম ও অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং চ্যানেল আইয়ের পরিচালক আবদুল মুকিত মজুমদার (মুকিত মজুমদার বাবু)।
এ ছাড়া স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত পাঁচ প্রতিষ্ঠান হলো- মুক্তিযুদ্ধে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চিকিৎসাবিদ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পল্লী উন্নয়নে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), সমাজসেবায় এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল ইন বাংলাদেশ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।
