পাকুন্দিয়ায় ভিজিএফ কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
হারিছ আহমেদ, কিশোরগঞ্জ থেকে
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
ছবি: কাগজ প্রতিবেদক
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চন্ডিপাশা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভিজিএফের চালের কার্ড বিতরণকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদ উপলক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ পাওয়া ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চালের কার্ড বিতরণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থের বিনিময়ে কার্ড বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে একটি কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর চাপের মুখে পড়েন সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য আব্দুল হাই।
এরই মধ্যে গত ১৭ মার্চ কয়েকটি গণমাধ্যমে “ভিজিএফ কার্ডের ভাগ না পেয়ে ইউপি সদস্যের বাড়িতে হামলার অভিযোগ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলছেন, প্রকাশিত সংবাদের সঙ্গে ঘটনার বাস্তবতার মিল নেই; বরং প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে একটি পক্ষকে জড়াতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চন্ডিপাশা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি কাইয়ুমের সঙ্গে ইউপি সদস্য আব্দুল হাইয়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে কাইয়ুম অল্প ভোটে পরাজিত হন। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত হওয়ার পর আব্দুল হাই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ চালের কার্ড বাছাইয়ে অনিয়ম করেছেন। এমনকি একাধিক কার্ড অর্থের বিনিময়ে বিক্রির অভিযোগও এখন এলাকাজুড়ে আলোচিত কাইয়ুমের অভিযোগ, কার্ডের হিসাব চাইতেই ভাইকে ডেকে নিয়ে মারতে চেয়েছে।
ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি কাইয়ুম দাবি করেন, ইউপি সদস্যের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ ছিল না। তবে দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ চালের কার্ড বিক্রির বিষয়টি নিয়ে তার কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
তিনি বলেন, গত ইউপি নির্বাচনে আমি তার কাছে ২৩ ভোটে হেরেছি। নির্বাচনের পর থেকে সে ওয়ার্ডের গরিব-অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ চালের কার্ড টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছে এমন তথ্য ও রেকর্ড আমার কাছে আছে। ৩টি কার্ড ১৩ হাজার ৭০ টাকায় বিক্রির বিষয়েও প্রমাণ আছে। এবার ঈদে সরকারের দেওয়া ভিজিএফের চালের কার্ডের হিসাব চাইতে গেলে আমার ছোট ভাই শাহীনকে ডেকে নিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। পরে সেটি ধামাচাপা দিতে কথিত সাংবাদিকদের দিয়ে আমার নামে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করানো হয়েছে।
ইউপি সদস্যের দাবি: ১৯০টি কার্ড চেয়ে না পেয়ে হামলা
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য আব্দুল হাই। তার ভাষ্য, কার্ড বিক্রির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন তিনি বলেন, আমি কারও কাছে কোনো কার্ড বিক্রি করিনি। কাইয়ুম আমার কাছে ১৯০টি কার্ড দাবি করে। আমি দিতে অস্বীকার করায় সে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং দলবল নিয়ে অস্ত্রসহ আমার বাড়িতে আসে। আমি ভয়ে দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে ছিলাম। তবে কেউ আহত হয়নি। আমাকে ধরিয়ে দিতে পারলে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার দেবে এমন কথাও সে ছড়িয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ইউপি সদস্যের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা বলছেন, বাড়িতে হামলার অভিযোগের সত্যতা তারা দেখেননি; বরং ঘটনার সময় উল্টো দিক থেকে উত্তেজিত অবস্থায় কয়েকজনকে মাঠের দিকে যেতে দেখেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল কাদের চান মিয়া বলেন, সংবাদের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল নেই। আমি ঘটনাস্থলের কাছেই জমিতে কৃষিকাজ করছিলাম। হঠাৎ দেখি আ. হাই মেম্বারের বাড়ির দিক থেকে তিনজন আসছে। একজনের হাতে কুদাল, আরেকজনের হাতে বল্লম, আরেকজনের হাতে লাঠির মতো কিছু ছিল। তারা খুব উত্তেজিত ছিল। পরে দেখি কাইয়ুমের ছোট ভাই শাহীন। তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, তাকে ডেকে এনে মারতে চাওয়া হয়েছে। পরে আমরা স্থানীয়রা গিয়ে তাকে রক্ষা করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিই।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, কাইয়ুমের বাড়ি থেকে ইউপি সদস্যের বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার এবং মাঝখানে একটি খাল রয়েছে। তাই কাইয়ুমের লোকজন গিয়ে হামলা চালিয়ে সহজে ফিরে আসার সুযোগ ছিল না। তার দাবি, আমরা নিজের চোখে দেখেছি, মেম্বার সাহেব, তার ছেলে এবং আরেকজন নারী ঈদগাহ মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল, তারা কাইয়ুমের ভাইকে মারতে যাচ্ছেন। তখন গ্রামবাসী তাদের ফিরিয়ে দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, এটা নতুন কিছু না। আমরা শুনেছি, এর আগেও গরিব-দুঃখী মানুষের আইডি কার্ড সংগ্রহ করে তাদের নামে বরাদ্দ চাল অন্যত্র বিক্রি করা হয়েছে। এখন নিজের অপরাধ ঢাকতেই বাড়িতে হামলার নাটক সাজিয়ে মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন, ভিজিএফের মতো স্পর্শকাতর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিস্বার্থ এবং সুবিধাভোগী বাছাইয়ের অস্বচ্ছতা একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিএনপি নেতার বক্তব্য: দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই মিথ্যাচার
চন্ডিপাশা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোমেন মাস্টার বলেন, ঘটনার আগে কিছু জানতাম না। পরে শুনলাম, কাইয়ুম আর আ. হাই মেম্বারের মধ্যে ভিজিএফের কার্ড নিয়ে তর্কবিতর্ক হয়েছে। কিন্তু মারামারি, হুমকি বা বাড়িতে হামলার কোনো সত্যতা আমরা পাইনি। তিনি দলীয় কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে সমন্বয় না করেই কার্ড বিলি করেছেন। এর আগেও পাশের ওয়ার্ডে কার্ড বিক্রির একটি কলরেকর্ড ভাইরাল হয়েছে। আমার কাছে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্যও ফোন দিয়ে ঘটনার সত্যতা জানতে চেয়েছেন। আমার মনে হয়, বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির বিরুদ্ধে মিডিয়ায় এমন মিথ্যাচার করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান, পিআইও ও ইউএনও যা বলছেন
চন্ডিপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শামছু উদ্দিন বলেন, বিষয়টি শুনেছি। তবে বাড়িতে হামলা হয়েছে এমন তথ্য আমার কাছে নেই। থানায় জিডি হয়েছে শুনেছি। পুলিশ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।
পাকুন্দিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল মান্নান বলেন,আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। ভিজিএফের চাল উপকারভোগীদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও স্যার ভালো বলতে পারবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, “আমার কাছেও এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি। তবে আমি পাকুন্দিয়া থানার ওসিকে বিষয়টি দেখতে বলেছি। পরে তিনি আমাকে কিছু জানাননি।
ঘটনার পর এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে ভিজিএফের কার্ড বণ্টনে আদৌ অনিয়ম হয়েছে কি না, কলরেকর্ডে ওঠা অভিযোগ কতটা সত্য, এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘হামলার অভিযোগ’ ব্যবহার করা হয়েছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না স্পষ্টভাবে। তবে স্থানীয়দের বড় একটি অংশ বলছেন, গরিব মানুষের খাদ্য সহায়তার কার্ড নিয়ে যে বিতর্ক সামনে এসেছে, তা শুধু একটি ওয়ার্ডের সংকট নয়; বরং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
