বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তেল-গ্যাস বেশি কেন?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪২ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাসের প্রাচুর্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর এই বিপুল সম্পদ যেমন আশীর্বাদ, তেমনি নানা চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।
এই কারণেই ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মতো বড় কোনো উত্তেজনা দেখা দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে এবং সংকট তৈরি হয়।
পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই অঞ্চলের হাইড্রোকার্বন মজুতের ব্যাপকতা সত্যিই বিস্ময়কর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় ৩০টিরও বেশি ‘সুপারজায়ান্ট’ তেলক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে প্রতিটিতে অন্তত পাঁচ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত আছে।
এছাড়া এখানকার তেলকূপগুলোতে দৈনিক উৎপাদন উত্তর সাগর বা রাশিয়ার অনেক শীর্ষ তেলক্ষেত্রের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিলা স্তরের বিশেষ গঠনই এই অঞ্চলে তেল-গ্যাসের আধিক্যের মূল কারণ। এই অঞ্চলে হাইড্রোকার্বন উৎপাদন এবং সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদানই আদর্শভাবে বিদ্যমান। ফলে সহজ উৎপাদন ও বিশাল মজুদের কারণে এই অঞ্চল জ্বালানি ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে এবং এর কাছাকাছি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীও নেই।
ইতিহাস বলছে, শেষ বরফযুগের পর প্রায় ১৪ হাজার থেকে ৬ হাজার বছর আগে পারস্য উপসাগর গঠনের সময় থেকেই এখানে তেল ও গ্যাসের উপস্থিতি মানুষের নজরে আসে। অনেক স্থানে প্রাকৃতিকভাবেই তেল ও গ্যাস নিঃসরণ হতো। প্রাচীনকালেই মানুষ নৌকা জলরোধী করতে এবং নির্মাণকাজে বিটুমিন ব্যবহার করত।
আধুনিক যুগে ১৯০৮ সালে পশ্চিম ইরানে প্রথম বড় তেলের সন্ধান মেলে। এরপর ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকে অনুসন্ধান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে যায় বিশ্বের আর কোথাও এত বড় পরিসরে তেল-গ্যাসের মজুত নেই। যদিও রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিনেও বড় মজুত পাওয়া গেছে। তবুও উৎপাদন ক্ষমতা ও মজুদের দিক থেকে পারস্য উপসাগরের সঙ্গে তারা পাল্লা দিতে পারেনি।
আরো পড়ুন : ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আশা দেখছে হোয়াইট হাউস
ভূতাত্ত্বিক অবস্থান
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখানে অ্যারাবিয়ান ও ইউরেশিয়ান- এই দুইটি টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ ঘটে। প্রায় সাড়ে তিন কোটি বছর ধরে চলা এই সংঘর্ষে ভূ-গর্ভে তীব্র চাপ ও তাপ তৈরি হয়েছে, যা তেল ও গ্যাস উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। ইরান অংশে জাগরোস পর্বতমালা গঠিত হয়েছে, যা ভাঁজ ও ফাটলযুক্ত শিলাস্তরের জন্য পরিচিত। অন্যদিকে আরব উপকূলে তৈরি হয়েছে গম্বুজ আকৃতির বিশাল ভূ-গঠন, যা তেল ও গ্যাস জমা রাখার জন্য আদর্শ। উপসাগরের নিচে একটি বিশাল অববাহিকা রয়েছে যেখানে পলি জমে উচ্চ তাপ ও চাপের মধ্যে তেল-গ্যাস তৈরি হয়েছে।
তেল উৎপাদনকারী শিলা
সামুদ্রিক অণুজীবের জৈব পদার্থ থেকে তেল ও গ্যাস তৈরি হয়। এগুলো কাদামাটি ও চুনাপাথরের স্তরে জমা হয়ে পরে তাপ ও চাপে রূপান্তরিত হয়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই ধরনের শিলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। জুরাসিক ও ক্রিটেসিয়াস যুগে গঠিত শিলাস্তরগুলোতে বিপুল পরিমাণ জৈব পদার্থ রয়েছে, যা তেল উৎপাদনের জন্য আদর্শ।
মজুতের কাঠামো
এই অঞ্চলের ভাঁজযুক্ত ও গম্বুজাকৃতির শিলাস্তর তেল-গ্যাস আটকে রাখতে সাহায্য করে। জাগরোস পর্বতমালার বাঁকানো গঠন এবং আরব প্লেটের গম্বুজ কাঠামো বিশাল রিজার্ভ তৈরি করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র সৌদি আরবের ঘাওয়ার এবং সাউথ পার্স-নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র এই অঞ্চলেরই অংশ। এখানে শত শত বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও বিপুল পরিমাণ গ্যাস মজুত রয়েছে। চুনাপাথরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তেল-গ্যাস প্রবাহকে সহজ করে এবং উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
পৃথিবীর মাত্র তিন শতাংশ ভূখণ্ডের নিচে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক তেল এবং ৪০ শতাংশ গ্যাস মজুত রয়েছে এই অঞ্চলে। গবেষণা অনুযায়ী, এখনও বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি যেমন হরাইজন্টাল ড্রিলিং ও ফ্র্যাকচারিং ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন আরো বাড়ানো যেতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, অনন্য ভূতাত্ত্বিক গঠন, উপযুক্ত শিলা, এবং বিশাল মজুতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য আজও বিশ্বের প্রধান জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
