ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত
ট্রাম্পকে রাজি করাতে পাকিস্তানের নেপথ্য কৌশল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ১১:১০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাতে অপ্রত্যাশিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা অনেককেই বিস্মিত করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ভূমিকার পেছনে রয়েছে কৌশলগত সম্পর্ক, আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক উদ্যোগ।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্প তাকে প্রায়ই “তার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” বলে উল্লেখ করেন এবং মনে করেন, তিনি ইরানকে অনেকের চেয়ে ভালো বোঝেন।
ইরান পাকিস্তানের প্রতিবেশী, যার সঙ্গে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক বিদ্যমান। একইসঙ্গে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানঘাঁটি নেই এবং উপসাগরীয় অনেক দেশের মতো সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েনি। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান নিজেকে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করছে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে।
তবে এই ভারসাম্য রক্ষা মোটেই সহজ নয়। একদিকে আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা, অন্যদিকে নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি পাকিস্তানকে কঠিন অবস্থানে ফেলেছে। গত বছর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা পর্যন্ত তৈরি করেছিল, আর বর্তমানে আফগান সীমান্তেও সংঘাত চলছে।
আরো পড়ুযন : খারগ দ্বীপ দখলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা, নেপথ্যে যে কৌশল
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পাকিস্তানের বড় ঝুঁকি রয়েছে। দেশটি ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল, যার বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম ও অর্থনৈতিক চাপ ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার সপ্তাহে চারদিন কর্মদিবস চালুর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান।
এছাড়া, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি সৌদি আরব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে পাকিস্তানকে সেই চুক্তির কারণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এতে দেশের পশ্চিম সীমান্ত আরো অরক্ষিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরেও চাপ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর পাকিস্তানে ইরানপন্থী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জনমত ব্যাপকভাবে ইরানের পক্ষে।
তবে এই মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের লাভের সম্ভাবনাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করা এর অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রচেষ্টা সফল হলে পাকিস্তান বৈশ্বিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।
এদিকে পাকিস্তান ইতোমধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে কিছু কৌশল নিয়েছে। ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংকটে ট্রাম্পের ভূমিকার জন্য তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া এবং আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহারের সময় কাবুল বিমানবন্দর হামলার অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হস্তান্তর করা—এসব পদক্ষেপ সম্পর্ক উষ্ণ করতে ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এখন মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট বা বহু-সারিবদ্ধকরণ নীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে। ইরানের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বড় সুবিধা হলো, তাদেরকে অতিরিক্ত মার্কিনপন্থী বা ইসরায়েলপন্থী হিসেবে দেখা হয় না। এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এর আমন্ত্রণে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন।
তবে সবশেষে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে? বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এবং কঠোর অবস্থানের কারণে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তারপরও পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে, যা সফল হলে যেমন বড় অর্জন হবে, ব্যর্থ হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের সক্রিয় উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
