কোটি টাকার সেতুতে নেই সংযোগ সড়ক
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সংলগ্ন লতাচাপলি ইউনিয়নের একটি আরসিসি স্লাব সেতু এখন উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং এলাকাবাসীর দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও, সংযোগ সড়ক না থাকায় দীর্ঘ চার বছর ধরে এটি ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, “দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প”-এর আওতায় লতাচাপলি ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী খালের ওপর ৩৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ফুটপাতসহ ৭ দশমিক ৩২ মিটার প্রস্থের সেতুটি নির্মাণ করা হয়। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খালের ওপর সেতুর মূল ঢালাই কাজ শেষ হলেও পূর্ব পাশে প্রায় ২০০ মিটার এবং পশ্চিম পাশে প্রায় ৫০ মিটার সংযোগ সড়কের কাজই শুরু হয়নি। ফলে সেতুটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংযোগ সড়ক না থাকায় মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ও কাঁচা রাস্তা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে দুই পাশ পানিতে ডুবে গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগী ও বয়স্ক মানুষজন।
জানা গেছে, সেতুর পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি আশ্রয়ণ কেন্দ্র, যেখানে ৬০টি পরিবার বসবাস করছে। এছাড়া খাজুরা আশ্রয়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাজুরা, বাহামকান্দা, ফাঁসিপাড়া ও কলইপাড়াসহ পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এই সেতু ব্যবহার করে ইউনিয়ন পরিষদ, মহাসড়ক, কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড এবং উপজেলা ও জেলা শহরে যাতায়াত করেন। এলাকার মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরাও পূর্বপাড়ের আলহাজ্জ আবু হানিফ খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে এ পথ ব্যবহার করে।
ফাঁসিপাড়া গ্রামের আয়েশা বেগম (৫৫) জানান, তার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতনি সোনিয়াকে প্রতিদিন এই পথ দিয়েই স্কুলে নিতে হয়। তিনি বলেন, “এখন পানি কম, তাই বাঁশের সাঁকো দিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু বর্ষায় দুই পাশ ডুবে যায়। তখন খুব কষ্ট হয়, অনেক সময় নাতনির স্কুল বন্ধ রাখতে হয়।”
খাজুরা আশ্রয়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জাকারিয়া জানায়, “পানি ভেঙে আর বাঁশের সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যেতে খুব ভয় লাগে।”
সেতুর পশ্চিম পাশের বাসিন্দা স্বপন হাওলাদার বলেন, “সংযোগ সড়কের জন্য ঘরের সামনে মাটি কেটে রাখা হয়েছে। বৃষ্টিতে সেখানে পানি জমে থাকে। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। এভাবে আর কতদিন?”
আশ্রয়ণ সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তিন বছর আগে এই এলাকায় পানিতে ডুবে স্কুলগামী দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি অপূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা, শিক্ষার্থী এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হলেও প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি এখন এলাকাবাসীর কাছে এক নির্মম বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে।
এলজিইডি কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে পটুয়াখালী চেম্বার্স অফ কমার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ঠিকাদার গিয়াস উদ্দিন কাজটির কার্যাদেশ পান। পরে তিনি কাজটি অন্যের কাছে হস্তান্তর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ৯ মে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে এলজিইডি কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনির হোসেন বলেন, “নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় এলাকাবাসী ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে এখন সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। আশা করছি মে মাসের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ হবে।
