দুঃখ কী এবং কেন?
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মানসিকভাবে আহত হলে মানুষের দেহ-মনে অস্বস্তিকর ও পীড়াদায়ক এক অনুভূতির জন্ম নেয়। দেহ-মনে সৃষ্ট এই অপ্রীতিকর অনুভূতির নাম ‘দুঃখ’। দুঃখের ফলে সৃষ্টি হওয়া মানসিক যন্ত্রণা শারীরিক যন্ত্রণার মতোই অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। দুঃখের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মহননের পথ পর্যন্ত বেছে নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর ৭ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে অর্থাৎ দুঃখের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯১৭ জন এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০ জন মানুষ আত্মহত্যা করছে।
মানুষ তার বর্তমান অবস্থা নিয়ে সুখী নয়। বর্তমানে বিরাজমান অতৃপ্তিকে দূর করার জন্য ভবিষ্যৎকে সে প্রতিনিয়ত প্রত্যাশা করছে নিজের মতো করে। আর প্রত্যাশিত জিনিস না পেলেই আমরা দুঃখ পাই। যেমন পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার প্রত্যাশা করেছিলাম; প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তাই দুঃখ পেয়েছি। চাকরির প্রত্যাশা করেছিলাম; প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, দুঃখ পেয়েছি। অথবা পদোন্নতি চেয়েছিলাম, হয়নি বলে দুঃখ পেয়েছি। ব্যবসায় সফল হতে চেয়েছিলাম, প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তাই দুঃখ পেয়েছি। এমনকি বিয়ে করে সুখী হতে চেয়েছিলাম; প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তাই দুঃখ পেয়েছি।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, আমরা ক্রমাগত প্রত্যাশা করেই চলেছি। প্রাপ্তি যখন প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হচ্ছে তখন আমরা দুঃখ পাচ্ছি। হতাশায় ডুবে যাচ্ছি; বিরক্ত বোধ করছি। এই হতাশা কিংবা বিরক্তিও দুঃখ ভোগের প্রাথমিক অবস্থা। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে সব সময় দূরত্ব বিরাজ করে। প্রত্যাশা-প্রাপ্তির মাঝে বিরাজমান এই দূরত্ব যত বাড়তে থাকে মানুষের দুঃখ তত বাড়তে থাকে। আমরা মূলত প্রত্যাশা অপূর্ণ থাকার এই অতৃপ্তিকে বয়ে বেড়াই।
আবার প্রাপ্তি ঘটার পরও আমরা প্রত্যাশা করি সেই প্রাপ্তিকে ধরে রাখতে। বাপ-দাদার সম্পদ, পারিবারিক ব্যবসা, নিজের অটুট স্বাস্থ্য, সামাজিক সম্মান আর মর্যাদা যা কিছু আমরা পাই, যা কিছু আমাদের আনন্দ দেয়, আমরা প্রত্যাশা করি সেই প্রাপ্তিকে ধরে রাখতে। কিন্তু একটা সময় আসে যখন আমরা উপলব্ধি করি যে, প্রাণপণ ধরে রাখার চেষ্টা করেও মানুষ আসলে তার কোনো প্রাপ্তিকে ধরে রাখতে পারে না। এই প্রাপ্তিগুলো হয় তাকে ছেড়ে চলে যায় অথবা সে নিজেই এই প্রাপ্তিগুলোকে ধরে রাখতে পারে না। তখন সে দুঃখ পায়।
এই যে আমরা প্রত্যাশার কথা বলছি, এই প্রত্যাশা আসলে কী? প্রত্যাশা হলো কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা। এটি মূলত একটি ভাবনা বা চিন্তা। এই ভাবনা ভবিষ্যতে ফল লাভের ভাবনা। প্রত্যাশার এই ভাবনা সর্বদা নিশ্চয়তা অনুসন্ধান করছে। এই ভাবনা কিছু পাওয়ার ভাবনা; যা তার অন্তর্গত অতৃপ্তিকে দূর করে। প্রাপ্তি যখন প্রত্যাশার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হয় তখন তা আমাদের মধ্যে অতৃপ্তি সৃষ্টি করে। যা আমাদের দুঃখ দেয়। এই অতৃপ্তি আবার নতুন করে প্রত্যাশার জন্ম দেয়।
আবার কিছু জিনিস আছে যা আমরা মোটেও প্রত্যাশা করি না। বলা যেতে পারে, আমরা এগুলোকে এড়িয়ে যেতে চাই বা পরিহার করতে চাই। যেমন ব্যবসায় ক্ষতি আমরা প্রত্যাশা করি না; কিন্তু ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হই। চাকরি হারানোর প্রত্যাশা না করলেও চাকরি হারাই। প্রত্যাশা না করলেও অর্থনাশ হয় এবং আমরা বলি, ‘আমার সর্বনাশ হয়েছে’। অসুস্থতা প্রত্যাশা করি না; কিন্তু তারপরও অসুস্থ হই। ব্যর্থতা প্রত্যাশা করি না; কিন্তু ব্যর্থ হই। দীর্ঘ প্রতীক্ষা প্রত্যাশা করি না; কিন্তু আমাদের প্রতীক্ষা করতে হয় এবং আমরা বিরক্তি বোধ করি। এভাবেই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা প্রত্যাশা করি না; কিন্তু এমন ঘটনা ঘটে যায়। হাজার চেষ্টা করেও যখন আমরা এসব এড়াতে ব্যর্থ হই তখন তা আমাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ক্রোধ বা রাগ সৃষ্টি করে; যা রূপান্তরিত হয় হতাশায় এবং শেষপর্যন্ত তা আমাদের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ কিছু জিনিসকে আমরা জীবনে অতিমাত্রায় প্রত্যাশা করি। অতি প্রত্যাশিত এসব জিনিস না পেলে আমরা দুঃখ পাই। আবার কিছু জিনিসকে আমরা মোটেও প্রত্যাশা করি না; এড়িয়ে বা পরিহার পরিহার করতে চাই। না পারলে আমরা দুঃখ পাই।
তাহলে বলাই যায়, আমরা যা চাই, তা না পেলে আমরা দুঃখ পাই। আবার যা চাই না, তা পেলেও আমরা দুঃখ পাই। চাওয়ার সঙ্গে যখন ‘আমি’ নিজেকে সংযুক্ত করে বা জড়িয়ে ফেলি তখন আমরা দুঃখ পাই। এই ‘আমি’টা আসলে কে? এই আমি হলো আমাদের অন্তর্গত অহম। অহম কী? অহম হলো নিজের সম্পর্কে চিন্তা দিয়ে নির্মিত ধারণা বা ছবি, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। অহম হলো বিভ্রান্তি। মরীচিকার মতো অস্তিত্বহীন। অহম একটি মিথ্যা; যে মিথ্যাকে আমরা সত্য বলে মনে করি। অহম যেহেতু মিথ?্যা তাই অহম কখনো মানুষকে সুখী করতে পারে না। সে কারণে অহমের পরিতৃপ্তির জন্য কাজ করলে বা অহমের পরিতৃপ্তির জন্য বেঁচে থাকলে মানুষ দুঃখ পায়। অজ্ঞানতাবশত মানুষ এই অহমের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে এবং জগৎজুড়ে মানুষ এই অহমেরই দাসত্ব করছে। তাই মানুষের জীবনে এত এত দুঃখ বিরাজ করছে।
মানুষের মস্তিষ্ক সব সময় সবকিছুকে স্মৃতিতে ধারণ করছে। আর স্মৃতি মানেই চিন্তা বা ভাবনা। স্মৃতিতে সংরক্ষিত এই ভাবনা বা চিন্তা দিয়ে আমরা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে চাই। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে ভাবনা বা চিন্তার সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং আমরা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ভাবনা বা চিন্তার জগতে হারিয়ে যাই। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক বাস্তবতা এবং চিন্তার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।
আমরা বলতে পারি যে, আমাদের বরফ প্রতিনিয়ত গলে যাচ্ছে। বরফের গলে যাওয়াকে আমরা প্রত্যক্ষ করি; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করতে অস্বীকার করি। তাই আমরা বরফের ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের কথা ভুলে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমাদের অজ্ঞানতা এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। পার্থিব জগতে আমরা সবাই এক টুকরো বরফ নিয়ে সুখী হওয়ার চেষ্টা করছি। গলতে গলতে বরফ একসময় আর থাকে না, ফলে আমাদের সুখও আর থাকে না এবং আমরা দুঃখে আপতিত হই। এমন অবস্থায় দুঃখ নিবারণের জন্য আমরা সবসময় জীবনকে ভিন্নভাবে প্রত্যাশা করি। অথচ বাস্তবতা হিসেবে জীবন বারবার আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা ভিন্ন হওয়ার কারণে, উদ্ভূত বাস্তবতাকে আমরা যত এড়িয়ে যেতে চাই, আমাদের দুঃখ তত বাড়তে থাকে।
বুনো বানর ধরার জন্য এক ধরনের খাঁচা ব্যবহার করা হয়, যে খাঁচার বিশেষত্ব হচ্ছে, বানর তার হাতের মুঠো উন্মুক্ত অবস্থায় খাঁচায় প্রবেশ করাতে এবং বের করতে পারে; কিন্তু মুঠো পাকানো অবস্থায় তা করতে পারে না। বুনো বানরদের আকর্ষণ করতে খাঁচার ভেতর কিছু বাদাম রাখা হয়। বাদামের লোভে বানরের উন্মুক্ত হাত সহজেই খাঁচার ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু বাদাম ধরার পরে উন্মুক্ত হাত স্বাভাবিকভাবেই মুঠো পাকানো অবস্থায় চলে যায়। বানর বাদামের লোভও ত্যাগ করতে পারে না, হাতের মুঠোও উন্মুক্ত করতে পারে না। ফলে সে হাত আর বের করতে পারে না। বাদামের লোভ বানরকে আটকে রাখে এবং একসময় সে সহজেই শিকারির হাতে ধরা পড়ে যায়। বাদামের লোভ যেভাবে বানরকে খাঁচাতে আটকে রাখে, বস্তু এবং ভোগের প্রতি আসক্তিও তেমনি আমাদের পার্থিব জগতের সঙ্গে আটকে রাখে। পরিণতিতে আমরা দুঃখ পাই।
দুঃখমুক্তির জন্য তাই প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে বিরাজমান দূরত্ব কমাতে হবে। দুঃখ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো আসক্তির বিনাশ সাধন। আসক্তির অবসান ঘটলেই অনাসক্তির আবির্ভাব ঘটবে। অনাসক্ত জীবন হলো কচুপাতার পানির মতো। বৃষ্টির পানি যেমন কচুপাতাকে ভেজাতে পারে না ঠিক তেমনি অনাসক্ত ব্যক্তিকে জীবন দুঃখ দিতে পারে না। মেডিটেশন বা ধ্যান আমাদের আসক্তির বিনাশ ঘটাতে সাহায্য করে। মানুষ আনন্দ নিয়ে বঁাঁচতে শেখে। আসুন আমরা সবাই আনন্দ নিয়ে বাঁচি।
আসিফ হাসান চৌধুরী : পিএইচডি, মলিকুলার বায়োলজি।
