স্মার্ট সিটি ধারণা: ঢাকার বাইরে নগর অর্থনীতি গড়া কি সম্ভব?
সাকিফ শামীম
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
সাকিফ শামীম। ছবি : ভোরের কাগজ
বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের প্রায় সব কেন্দ্রবিন্দু আজও ঢাকা। ফলে রাজধানী একদিকে যেমন দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে তেমনি এটি অতিরিক্ত জনঘনত্ব, যানজট, আবাসন সংকট এবং পরিবেশ দূষণের ভারে নুইয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এই চাপ কমিয়ে ঢাকার বাইরে কি নতুন নগর অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব? উত্তর হলো, শুধু সম্ভবই নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এটি এখন অপরিহার্য।
সাম্প্রতিক সময়ে নগর বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, দেশের উন্নয়নকে ঢাকাকেন্দ্রিক রাখলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরো বাড়বে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে, সময় নষ্ট হচ্ছে এবং শহুরে জীবনমান দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
একটি স্মার্ট সিটি মানে শুধু উঁচু ভবন, ফ্লাইওভার বা ডিজিটাল সাইনবোর্ড নয়। একটি সত্যিকারের স্মার্ট সিটি হলো পরিকল্পিত নগরজীবনের সমন্বিত রূপ, যেখানে নাগরিকের জীবনযাত্রা হবে সহজ, নিরাপদ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব। এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সমন্বিত নগর সুবিধা।
প্রথমত, প্ল্যানিং। একটি নতুন নগর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে শুধু আবাসন নয়, একইসঙ্গে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টার, বিনোদন এলাকা, খেলার মাঠ, শপিং জোন এবং অফিস স্পেস—সবকিছুকে একসঙ্গে পরিকল্পনায় আনতে হবে। মানুষ যেন কাজ, শিক্ষা ও দৈনন্দিন সেবা পেতে ঢাকার দিকে ছুটে না আসে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য।
আরো পড়ুন : অন্তর্বর্তী সরকারের টিকার অব্যবস্থাপনায় শিশুমৃত্যুর মিছিল
দ্বিতীয়ত, ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট ও এলিভেটেড অবকাঠামো। ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা হলো লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি বা শেষ প্রান্তের সংযোগ। নতুন শহরগুলোতে উড়াল সড়ক, বিশেষায়িত বাস দ্রুতগামী গণপরিবহন, স্মার্ট ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীবান্ধব ফুটপাত থাকলে সেই শহরগুলো দ্রুত বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবে। শুধুমাত্র রাস্তা নির্মাণ নয়, রাস্তার সঙ্গে কর্মসংস্থান ও আবাসনের পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
এখানেই আসে স্যাটেলাইট শহর মডেলের গুরুত্ব। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার বাইরে স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার যে ধারণা সামনে এনেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নগর সুবিধাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। অর্থাৎ মানুষকে ঢাকায় না এনে, সুযোগ-সুবিধাকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
এই ধারণাটি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং সিলেটের মতো শহরগুলোকে নতুন অর্থনৈতিক ক্লাস্টারে রূপ দেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল, আইটি পার্ক, শিক্ষা নগরী এবং মেডিকেল সিটি—এমন থিমভিত্তিক নগরায়ণ দেশের অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক করবে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টেকসই ও স্মার্ট সিটি গড়ে তুলে সবুজ প্রকল্প। আজকের বিশ্বে কোনো স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা পরিবেশবান্ধব না হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের নতুন শহরগুলোতে সবুজ অবকাঠামোকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেমন, ছাদে সৌরশক্তি ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, স্মার্ট ড্রেনেজ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র, নগর বন ও সবুজ বেষ্টনী, বৈদ্যুতিক গণপরিবহন, জলাধার ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা ইত্যাদি।
এগুলো শুধু পরিবেশ রক্ষা করবে না, বরং নতুন গ্রিন ইকোনমি তৈরি করবে। নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর কৃষি এবং জলবায়ু-সহনশীল নির্মাণ, এসব খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতায় গ্রিন প্রজেক্টকে নগর অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নতুন শহরগুলোতে স্মার্ট কৃষি বলয়, শহরতলী খাদ্য অঞ্চল এবং নগর সরবরাহ কেন্দ্র তৈরি করলে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে স্মার্ট সিটি তৈরি হয় না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শাসন ও বিকেন্দ্রীকরণ। স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন না করলে ঢাকার বাইরে কোনো শহরই কার্যকর অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে না। বর্তমানে অনেক জেলা শহরে অবকাঠামো থাকলেও মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্পোরেট কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে।
তাই প্রয়োজন একটি জাতীয় নগর বিকেন্দ্রীকরণ নীতি, যেখানে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে কোন শহর কোন খাতে বিশেষায়িত হবে। উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহী হতে পারে শিক্ষা ও গবেষণা নগরী, খুলনা হতে পারে ব্লু-ইকোনমি ও শিল্প নগরী, চট্টগ্রাম হতে পারে বন্দর ও লজিস্টিক স্মার্ট সিটি, আর সিলেট হতে পারে মেডিকেল ও ট্যুরিজম হাব।
সবশেষে, ঢাকার বাইরে নগর অর্থনীতি গড়া শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। স্মার্ট সিটি মানে প্রযুক্তি, পরিকল্পনা, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনমান—সবকিছুর সমন্বয়। যদি সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসন, গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং বিকেন্দ্রীকৃত কর্মসংস্থানের মডেল বাস্তবায়ন করা যায়, তবে ঢাকার বাইরে নতুন অর্থনৈতিক নগরসভ্যতা গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব।
লেখক : অর্থনীতিবিদ
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার
ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ
