×

বিশেষ সংখ্যা

বেলা-অবেলা

Icon

নিয়াজ জামান সজীব

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

বেলা-অবেলা

বেলা-অবেলা

সময় চলে গেলে আর তা ফিরে আসে না। হালকা বা মোটা দাগগুলো কেউ রেখে দেয়, কেউ ভুলে যায়। বেলা শেষে ফিরে এসে সবকিছু ফিরে পেতে নেই। আবার অবেলায় কিছু পেতে নেই। জীবন কেমন যেন চাওয়া পাওয়ার হিসেবের এক সাইকেল, এক ধাঁধা। যা বেলা-অবেলার সমীকরণে চলে। বেলা শেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সন্ধ্যা ফুরোলে রাত। আর রাতের মধ্যভাগে অনেকেইে দুঃখবিলাসী হয়। কেউ সত্যিকারের দুঃখ নিয়ে ভাবে-কাঁদে, অবেলার শোক-তাপ মানুষকে পোড়ায়। অনেকেই খাঁটি হয়। 

এসো হে বৈশাখ, ঝড়-বৃষ্টি, কালবৈশাখি নিয়ে আসে। তাপস-নিঃশ্বাস- ধুলিকণা উড়িয়ে চলে যায়। অবেলায় আসে আষাঢ়। কারো বেলায় বৃষ্টির রিনি-ঝিনি কাঁপন তুলে সময়কে দারুণ করে তোলা আবার অতিবৃষ্টি কৃষকের কপাল পুড়িয়ে দেয়। অবেলার ঢলে নদী ভেঙে সহায়-সম্বল সব হারিয়ে ফেলে নদী ভাঙা মানুষ। তাই বৃষ্টিরও বেলা-অবেলা থাকে। দিয়ে যায় সুর, নিয়ে যায় বেদনা-দূর-বহুদূর।

বৈশাখ মঙ্গল না অমঙ্গল? বেলা- না অবেলার কলতান, তা কে জানে! তবুও হাজারো মুখের উচ্চারিত বিষয় নিয়ে চলে টানাটানি। সংসারে নিন্মবিত্তের টানাটানি, সেও বুঝি অবেলায় জন্ম নেয়া বা বেলা বুঝে কাজ না করার ফলাফল।

ছোট বেলায় অনেক বিষয় আমাদের জন্য একপ্রকার নিষিদ্ধ ছিলো। সময়ের সাথে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে যেমন বড়ো হয়েছি, তেমনি কত নিষেধ যে এখন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কে তার খোঁজ রাখে? জেনেছি এ জমিনে কার কতটা অবদান। কার কতটা হারানোর বেদনা ও প্রাপ্তি নিয়ে পথচলা।

তাইতো বলি, বেলা থাকতে সঠিক সিদ্ধান্ত নাও। অবেলায় সবই সয়ে যায়। কিন্তু দাগ থেকে যায়। সে সীমানার বেড়াজাল পেরিয়ে মন ঠিকই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। তবে রয়ে যায় অবেলার সে ভয়ানক ব্যথা। সঠিক বেলা বা সময়ের প্রাপ্য মানুষকে আরও সামনে যাওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। আর অবেলার না পাওয়া বা বঞ্চিত হওয়ার কষ্ট মানুষকে কখনো অভিজ্ঞ আবার কখনো প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে।

তাঁর বেলায়, যে জীবনানন্দ দাশকে আমাদের পূর্বসূরিরা চিনতে পারেনি, আমাদের বেলায় তিনি আজ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে পঠিত ও আলোচিত উজ্জ্বল, দীর্ঘ দমের কবি। জীবনানন্দ দাশের ‘বেলা অবেলা কালবেলা’য় তিনি লিখেছেন- ‘আমার আকাশ কালো হতে চায় সময়ের নির্মম আঘাতে; জানি, তবু ভোরে রাত্রে, এই মহামারি কাছে নদী খেত বনানীর ঝাউয়ের ঝরা সোনার মতন সূর্য তারা বীথির সমস্ত অগ্নির শক্তি আছে।’

তাই বেলার কাজ বেলাতেই করতে হয়। মানুষের মর্যাদাও বেশি থাকতে দিতে হয়। অবেলার হাহাকার কে আর মনে রাখে? নিয়ম ও আইন মেনে যে যেভাবে পারে জীবন কাটালে সমস্যা কোথায়? 

কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়। তাইতো বেলা থাকতে কাজ করো। অবেলায় আর শত কাজ করেও একটি কাজের যথার্থতা প্রমাণ করা যাবে না। যে বেলা অলক্ষ্যে মুচকি হেসে চলে যায়, তা কি আর ফিরে আসে?

তবে উলটো দিকও আছে। বেলার গল্প অবেলায় অনেকে নিজের মতো করে বলে-লেখে। হায় সময়, তুমি যে কাকে কীভাবে ধরা দাও বোঝা দায়। বেলা শেষে ফিরে এসে রোদের মতো জ্বলতে না পেরে নিভে যায় বেদুইন বালুকনায়। 

নিজের বেলায় অনেকে আবার ষোলো আনা। অন্যের বেলায় ফুটো পাই। ফুটো পাই মানে অচল পয়সা।

আজ যে অচল, কাল সে সচল। তাই তো বলি, এ বৈশাখে হাল ছেড়ো না। দম রাখো। বাতাসে কান পেতে রাখো। বেলা চলে যায় অবেলার বলী রেখায়। মৃত্যু সমান আস্তরণের সেই বারতায়। প্রেয়সীর কাকন কাঁপানো অনুভবের দ্যোতনায়। 

একবার যে আদর্শ জীবন বেলার বেলায় তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, তার স্রোত হঠাৎ থেমে গেলেও তা ফিরে যায় অবেলার সরল অঙ্কে। তাই বায়ু করে শণ শণ, কান করে ভন ভন, হৃদয় হয় খান খান।

তবুও দুই হাজার কিলোমিটার দূরের খানেদের কাছে হারে নাই লাখো-কোটি মন। আদর্শের সে বীজ যে করেছে বপন। তার জন্য বাংলা নববর্ষের হর্ষ ধ্বনি আজীবন।

নারী ও নদী কখনো ফেরে না। কবির এ কথা বেলা-অবেলায় ধ্বনিত হয় জলের নিঃসঙ্গ আয়নায়।

এক জটিল রহস্য, কে যে কার বেলায় বাঘ আর কার বেলায় বেড়াল! কারো মধ্যপ্রাচ্য হঠাৎ বেড়ে যায়। আর কারো শুকিয়ে যায়। সময়-অসময়ের রোদের রেখায় তা দাগ রেখে মিলিয়ে যায়। 

এ বেলায় যে কারাগারে নিমর্মতার সাক্ষী। ওই বেলায় সে কারা রক্ষী। অবেলায় সেই মানুষটিই কানুন শেখায়। চৌদ্দ দিক তাকে শিখিয়েছে জীবন ছোট নয়। শুধু অবেলায় পাল তোলা নৌকার হাল শক্ত করে ধরে রাখতে হয়। যে কৃষক আজ ন্যায্য দাম পেলো না, এ বৈশাখে তাঁর কান্না হয়ত পরের বৈশাখে আশীর্বাদ হয়ে ফিরে আসবে ছোট কুটিরের জানালায়।

অবেলার ধৈর্যই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাতিয়ে তোলে নতুন করে শুরু করার। পান্তা ভাতে লবণ যতটাই মজার, দাম দিয়ে মাছ কিনেও ততটা স্বাদ পায় না জিহ্বা। কৃষিভিত্তিক এ সমাজে কৃষকের সম্মানই সবার চেয়ে বেশী হতে পারতো। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষ্যে তারা আনন্দের অংশীদার হতে পারতো। তবেই এ উৎসব পূর্ণতা পেতো।

অনেকে বলেন, এসব ভালো কথা লেখা সহজ। বলা আরও সহজ। কিন্তু বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন। জানি এসব সত্যি কথা। সত্য বড়ো কঠিন, তবু তারে ভালোবেসেই তো জীবন এগিয়ে যায়। সত্য খুঁজতেই তো মানবজনম চলে যায়।

লেখক: সাংবাদিক

টাইমলাইন: পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘আমাকে কোনো জমি দেওয়া হয়নি’

‘আমাকে কোনো জমি দেওয়া হয়নি’

বাংলাদেশিদের জন্য এআই ও রোবোটিক চিকিৎসায় মনিপালের উদ্যোগ

বাংলাদেশিদের জন্য এআই ও রোবোটিক চিকিৎসায় মনিপালের উদ্যোগ

পাকার আগে হাওরে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন-জীবিকা

পাকার আগে হাওরে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন-জীবিকা

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App