×

বিশেষ সংখ্যা

ঈদ-উল-ফিতর ২০২৬ আয়োজন

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি বিশেষজ্ঞদের একচেটিয়া ক্ষেত্র, নাকি জনগণের অধিকার?

Icon

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৬, ১১:২৬ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি বিশেষজ্ঞদের একচেটিয়া ক্ষেত্র, নাকি জনগণের অধিকার?

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি বিশেষজ্ঞদের একচেটিয়া ক্ষেত্র, নাকি জনগণের অধিকার?

বাংলাদেশের একটি সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি জনপরিসরে যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি গণতান্ত্রিক অধিকার, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক অংশগ্রহণের মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে যখন সদ্য সাবেক ইউনুস সরকারের প্রেস সচিব সহ কিছু প্রভাবশালী কণ্ঠ থেকে বলা হচ্ছে যে এই ধরনের চুক্তি বোঝার জন্য “ট্রেড এক্সপার্ট” হওয়া আবশ্যক, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কারণ এতে একধরনের বার্তা দেওয়া হয়-রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের বোঝার বাইরে, এবং তাই তাদের এ বিষয়ে কথা বলারও অধিকার সীমিত।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাণিজ্য চুক্তি এমন একটি বিষয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনে। কৃষক কী উৎপাদন করবেন, শিল্পপতি কীভাবে প্রতিযোগিতা করবেন, শ্রমিকের কর্মসংস্থান কতটা নিরাপদ থাকবে, এসবই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির ওপর। ফলে এটি কেবল অর্থনীতিবিদদের গবেষণার বিষয় নয়; বরং এটি একটি সর্বজনীন ইস্যু, যেখানে জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

আলোচিত চুক্তিকে ঘিরে সমালোচকদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন, এটি কোনো জটিল বা সূক্ষ্ম দরকষাকষির ফল নয়; বরং এতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে যা একতরফাভাবে বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করতে পারে। বিশেষ করে ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক সুবিধার নামে যদি এমন কোনো কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে বাস্তবে এক পক্ষ বেশি সুবিধা পায় এবং অন্য পক্ষ কেবল তার বাজার খুলে দেয়, তাহলে সেটি ন্যায্যতার প্রশ্ন তোলে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তিতে উভয় পক্ষের লাভের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়ার কথা।

এই প্রেক্ষাপটে কৃষি খাতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো চুক্তির ফলে বিদেশি কৃষিপণ্য শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে দেশে প্রবেশ করে, তাহলে স্থানীয় কৃষকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন কি না, এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। একইভাবে শিল্পখাতেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যেখানে দেশীয় উৎপাদকরা বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতিগত স্বাধীনতা বা পলিসি স্পেস। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্পকে রক্ষা করা, প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তুকি দেওয়া বা নির্দিষ্ট খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু যদি কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে এই নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিতর্কের আরেকটি দিক হলো তথ্যের স্বচ্ছতা এবং প্রাপ্যতা। যদি একটি চুক্তি সত্যিই দেশের জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে সেটি জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। বরং জনগণকে নিরুৎসাহিত করা, বা তাদের বোঝার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, একটি অস্বচ্ছ পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং তা সম্ভব হয় উন্মুক্ত আলোচনা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের মাধ্যমে।

এদিকে, কিছু মহল এই চুক্তি বিরোধিতাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পমালিক এবং পেশাজীবী মহল থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তারা চুক্তির নির্দিষ্ট কিছু ধারা বা শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। এই মতামতগুলো উপেক্ষা করা বা জনসমক্ষে না আনা হলে একটি অসম্পূর্ণ চিত্র তৈরি হয়, যা জনমত গঠনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় বড় জাতীয় ইস্যুতে সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। গ্যাস রফতানি, বিদ্যুৎ প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তি-এসব বিষয়ে জনমত অনেক সময় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সচেতন নাগরিক সমাজ একটি দেশের জন্য শক্তি, দুর্বলতা নয়।

‘বিশেষজ্ঞ বনাম সাধারণ মানুষ’- এই বিভাজনটি আসলে একটি ভ্রান্ত ধারণা। নিঃসন্দেহে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ প্রয়োজন, কারণ তারা তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে গভীর মূল্যায়ন করতে পারেন। কিন্তু সেই বিশ্লেষণ জনগণের আলোচনার বিকল্প নয়; বরং সেটি আলোচনাকে সমৃদ্ধ করার একটি উপাদান। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত এবং স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

সবশেষে বলা যায়, একটি বাণিজ্য চুক্তি কেবল কাগজে-কলমে কিছু ধারা ও শর্তের সমষ্টি নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই এই ধরনের চুক্তি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা এবং বিশ্লেষণ করা প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানকে সম্মান জানিয়ে, কিন্তু নিজেদের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে-এই ভারসাম্য বজায় রেখেই একটি সচেতন ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: সাংবাদিক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

আজ ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

আজ ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

হজযাত্রা নিয়ে জরুরি বার্তা মন্ত্রণালয়ের

হজযাত্রা নিয়ে জরুরি বার্তা মন্ত্রণালয়ের

১৯৭ পদে নিয়োগ দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস

১৯৭ পদে নিয়োগ দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস

পাকিস্তান-যাত্রার বিমানে নিহত ইরানি শিশুদের ছবি, পোস্ট ঘিরে ব্যাপক আলোচনা

পাকিস্তান-যাত্রার বিমানে নিহত ইরানি শিশুদের ছবি, পোস্ট ঘিরে ব্যাপক আলোচনা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App