×

মতামত

বিএনপির সামনে তিন চ্যালেঞ্জ

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

বিএনপির সামনে তিন চ্যালেঞ্জ

ছবি: রাসেল আহমদ

এখন পর্যন্ত সর্বশেষ দাবার চালে জয়ী হয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। প্রমাণ হয়েছে মার্কিন ডিপস্টেট সেদেশের প্রেসিডেন্টের চেয়েও শক্তিশালী। কারণ, ডিপস্টেট পেছনে আছে বলেই ইউনূস ট্রাম্পের অপছন্দের লোক হয়েও মার্কিন আনুকল্য পেয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন, এখনও আছেন এবং তারই পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচন হয়ে যাকে যত আসনে জেতানো দরকার ছিল, সবই পরিকল্পনামাফিক সম্পন্ন হয়েছে। আর সে কারণেই তিনি আবেগ সংবরণ করতে চাননি। নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় আনন্দের আতিশয্যে ‘মহা ঈদের মতো আনন্দ’ প্রকাশ করেছেন।

ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বারংবার অপমানিত হয়েও ভারত তার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়নি। শেষ বেলায় এসে ভারতও তাদের দাবার চালটি কৌশলে চালেছে। তারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে ‘সেকেন্ড বেস্ট অপশন’ হিসেবে বিবেচনা করে তারেকের দেশে ফেরার পথ সুগম করেছিল। তাদের প্রধান শঙ্কা ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর মতো আদর্শিকভাবে কঠোর একটি দল যেন এককভাবে ক্ষমতায় না আসে। জামায়াতের বিপরীতে বিএনপিকে তারা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার ধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করেছে। ভারত আরও মনে করে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সঙ্গে যেখানে সম্পর্ক থেমে গিয়েছিল, সেখান থেকেই নতুন করে ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।

ইউনূসের পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হলো?

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ জামায়াতকে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তারা বিএনপির সাম্প্রতিক তিন নির্বাচনের ফলাফল, নেতৃত্বের সংকট এবং মাঠের রাজনীতিতে দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে দলটিকে দুর্বল ভাবতে পারে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক প্রভাব, সেনাবাহিনীর একটি অংশের সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক কিছু মহলের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা জামায়াতকে শক্ত অবস্থানে রেখেছিল-এমন ধারণাও প্রচলিত ছিল।

কিন্তু ফলাফল ভিন্ন বাস্তবতা দেখিয়েছে। বিএনপি ২১৩টি আসন এবং জামায়াত জোট ৭৩টি আসন পেয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির হলেও রাজনৈতিক ভারসাম্য এখনো বহুমাত্রিক। ফলে ডিপস্টেট বা ইউনূসের পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ,এমনটা বলা কঠিন। বরং আসন বণ্টনের এই কাঠামো একটি নিয়ন্ত্রিত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়।

জুলাই সনদ এখন মূল কেন্দ্রবিন্দু। বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রেখেও তাতে স্বাক্ষর করেছে। ফলে বিপুল আসন পাওয়ার পরও তারা সনদ উপেক্ষা করলে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে সংবিধান পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হবে। নতুন কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর সমতুল্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উচ্চ কক্ষ-নিম্ন কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ চালুর কথাও বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে জামায়াত উচ্চ কক্ষে প্রায় সমশক্তিধর হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই রাজনৈতিক সমীকরণের সূক্ষ্ম জায়গা। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা প্রশ্নে বিএনপি একক সিদ্ধান্ত নিলে জামায়াত জোট সেটিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। আসন নয়, ভোটের অনুপাত হবে তাদের শক্তির উৎস। ফলে উপরিভাগে সৌহার্দ্য থাকলেও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত থাকবে।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী?

ভারত দলটির নেত্রীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং কূটনৈতিক সমর্থনও দেখিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা হলো-শক্তিই মূল সম্পদ। দল সংগঠিত না হলে, মাঠে সক্রিয় না হলে, কেবল অতীত ঐতিহ্য দিয়ে পুনরুত্থান সম্ভব নয়। গত দেড় বছরে দৃশ্যমান সাংগঠনিক পুনর্গঠন না থাকায় আন্তর্জাতিক সমর্থনও সীমিত থেকেছে। ভূরাজনীতিতে ‘ডেড হর্সে’ কেউ বাজি ধরে না-এ বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না।

যা লক্ষণীয়-গুরুত্বপূর্ণ বহু দেশ আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারত সবার আগে অভিনন্দন জানিয়েছে; পাশাপাশি পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, ভুটান, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ এবং জাতিসংঘও ফলাফল মেনে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নটিকে তাই ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

গণভোটের ফলাফল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট ৭৭ শতাংশ, ‘না’ ২৩ শতাংশ। যদিও মোট ভোটার উপস্থিতির সংখ্যা স্পষ্ট নয়। এই ফল যে কোনো একক আধিপত্যকে সীমিত করবে। কোনো ব্যক্তি দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না,এ বিধান কার্যকর হলে নেতৃত্বের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে। আবার ৫ শতাংশ ভোট পেলেই উচ্চ কক্ষে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ,এটি বহুদলীয় ভারসাম্য তৈরি করবে।

বিএনপি চাইলে পুরোনো সংবিধান অনুযায়ী দ্রুত সরকার গঠন করতে পারে। আবার জুলাই সনদ মানলে কাঠামোগত পরিবর্তন অনিবার্য। এখানেই কৌশলগত দ্বিধা। দলটির মহাসচিব ইতোমধ্যে সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক অবস্থান রয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত।

ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নেও একাধিক পথ খোলা। রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান করে শপথের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে কার্যত অকার্যকর করতে পারেন। আবার রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ হতে পারে। তৃতীয়ত, আইনি জটিলতা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের অনুমতিও দেওয়া সম্ভব।

বিএনপি কেন সনদের কিছু ধারা নিয়ে দ্বিধায়? মূলত দুই কারণে-এক. একই ব্যক্তি পরপর দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা। দুই. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল স্বাভাবিকভাবেই নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ সংসদকেন্দ্রিক রাখতে চাইবে। কিন্তু সনদের কাঠামো সেই একক নিয়ন্ত্রণে সীমা আরোপ করে।

রাষ্ট্রপতি প্রো-টেম স্পিকার নিয়োগ দিয়ে শপথ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন। এখানে যদি রাজনৈতিক মতবিরোধ দেখা দেয়, তা নতুন সাংবিধানিক বিতর্ক উসকে দিতে পারে। আবার শোনা যাচ্ছে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় তাকে আপাতত বহাল রাখার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-পরবর্তী ছয় মাস। বিএনপি যদি সংসদে বসে নতুন করে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেয় এবং প্রয়োজনে নতুন গণভোট আয়োজন করে, তবে নতুন রাজনৈতিক জানালা খুলতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় নির্বাচনের দাবিও উঠতে পারে। সেখানেই আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষীণ হলেও একটি সম্ভাবনা রয়ে যায়।

‘খেলা’ এখনও শেষ হয়নি। ৪৭৫ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি পরিচালনা সহজ কাজ নয়। উপরন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্য অভিঘাত অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে। গত দেড় বছরের অস্থিরতায় যে নতুন রাজনৈতিক ও আদর্শিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, তাদের ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে না।

সুতরাং ২১৩ আসন মানেই নিশ্চিন্ত শাসন নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না, যদি কাঠামোগত সংস্কার, কৌশলগত সমঝোতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়। রাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো-কেউ এককভাবে জয়ী নয়, আবার কেউ পুরোপুরি পরাজিতও নয়। সংখ্যার বিচারে বিএনপি সরকার গঠন করছে। প্রভাবের বিচারে জামায়াত শক্তিশালী বিরোধী শক্তি। কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে জুলাই সনদ এখনো নির্ণায়ক। আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দিক থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশল কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ দৃশ্যমান পরাজয়ের আড়ালেও শক্তির সঞ্চালন চলছে ভিন্ন স্তরে।

বিএনপির সামনে তিনটি তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট-

প্রথমত, ক্ষমতা গ্রহণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা।

দ্বিতীয়ত, জুলাই সনদ নিয়ে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান নির্ধারণ করা -মানবে, সংশোধন করবে, না কি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় পুনর্বিবেচনা করবে।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন।

জামায়াতের কৌশলও পরিষ্কার,সংসদে সহযোগিতার ভাষা, কিন্তু নীতিগত প্রশ্নে চাপের রাজনীতি। উচ্চ কক্ষ গঠিত হলে ভোটের অনুপাতে তাদের প্রভাব আরও দৃশ্যমান হবে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার দেখানোর সুযোগ বিএনপির নেই।

আওয়ামী লীগের জন্য বার্তাটি আরও কঠিন। আন্তর্জাতিক সমর্থন অপেক্ষা করে না,মাঠের শক্তিই শেষ কথা। সাংগঠনিক পুনর্গঠন ছাড়া প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ থাকবে। যদি নতুন গণভোট বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের প্রশ্ন সামনে আসে, সেটিই হতে পারে তাদের জন্য শেষ জানালা।

সবশেষে একটি বাস্তবতা অনস্বীকার্য-বাংলাদেশ এখন আর একমেরু রাজনীতির দেশে নেই। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, অংশগ্রহণমূলক প্রতিনিধিত্ব, নেতৃত্বের মেয়াদসীমা-এসব ধারণা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ভাঙবে। আর যদি রাজনৈতিক দলগুলো কৌশলগত সুবিধার জন্য সংস্কারকে আটকে দেয়, তবে নতুন অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হবে।

দাবার বোর্ড সাজানো হয়েছে। প্রথম চাল শেষ, কিন্তু ‘চেকমেট’ এখনও হয়নি। আগামী ছয় মাসই নির্ধারণ করবে এটি কি সত্যিকার সংস্কারের পথ, নাকি কৌশলগত সমঝোতার আরেকটি অধ্যায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ইরান যুদ্ধে ১৩ মার্কিন সেনা নিহত, আহত ৩৬৫

ইরান যুদ্ধে ১৩ মার্কিন সেনা নিহত, আহত ৩৬৫

নতুন সময়সূচির প্রস্তাব দিলেন দোকান ব্যবসায়ীরা

নতুন সময়সূচির প্রস্তাব দিলেন দোকান ব্যবসায়ীরা

দেশব্যাপী হামের টিকাদান শুরু রবিবার

দেশব্যাপী হামের টিকাদান শুরু রবিবার

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠক আজ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠক আজ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App