জ্বালানি সংকট
সামনে আরো বাড়বে লোডশেডিং
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
প্রতীকী ছবি
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির ঘাটতিতে চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। সামনে গ্রীষ্মজুড়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল, কয়লা ও এলএনজি আমদানিতে সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ সরবরাহে পড়তে পারে। দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। আগামী দেড় থেকে দুই মাস কমবেশি লোডশেডিং থাকবে, এমনকি কোনো কোনো সময় তা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা বিদ্যুৎ বিভাগের।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট। এতে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট।
জানা গেছে, কয়লাভিত্তিক আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ রয়েছে, যা ২৬ এপ্রিল চালু হতে পারে। এছাড়া বাঁশখালীতে এস আলমের এসএস পাওয়ার প্লান্টের একটি ইউনিটে সমস্যার কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। সেটি ২৮ এপ্রিলের পর স্বাভাবিক হতে পারে।
আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর মধ্যেও গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয়ের নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, যাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল, কয়লা ও এলএনজি আমদানিতে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আগের বকেয়া ও আর্থিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রীষ্মে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। তবে অর্থসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা কমানো হয়েছে এবং ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্র কম চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা বলেন, “জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ধরা হলেও উৎপাদন হতে পারে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এতে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও গ্যাস ও জ্বালানির স্বল্পতার কারণে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।”
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, গ্যাসচালিত কেন্দ্রের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করতে দৈনিক ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে উৎপাদন অর্ধেকেরও কম হচ্ছে।
ভর্তুকি ও আর্থিক চাপ
এদিকে ২১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ খাতে ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ মূলত বেসরকারি রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ব্যয় করা হবে।
পিডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। ডলারের দাম বা জ্বালানির মূল্য বাড়লে এ পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানিও ব্যাহত হচ্ছে। এতে আগামী তিন মাসে অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়তে পারে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৩৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেড়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
