×

জাতীয়

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে ফের সিন্ডিকেটবাজীর আশঙ্কা

Icon

হরলাল রায় সাগর

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে ফের সিন্ডিকেটবাজীর আশঙ্কা

ছবি : সংগৃহীত

দুই বছর পরে খোলার পথে রয়েছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার। দুই দেশের সরকারের আন্তরিকতায় এই আশার সঞ্চার হয়েছে। উভয় দেশ বলছে, আগের মতো কোনো সিন্ডিকেট ও অনিয়ম থাকবে না। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কম খরচে ও কম অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী নিয়োগ ও বসবাসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। দালালের দৌরাত্ম্য রুখতে এবার যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। অভিবাসন ব্যয়ের পুরো ভার থাকবে নিয়োগকর্তার ওপর। একইসঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এছাড়া মানবপাচারের অপ্রমাণিত মামলা ও চলমান তদন্ত নিষ্পত্তিসহ কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। তবে শ্রমবাজার কবে চালু হবে তা নিশ্চিত নয় সরকার।

সরকারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও জনশক্তি রপ্তানি খাতের অংশীজন ও বিশিষ্টজনরা ফের শ্রমবাজার মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে পড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেটের কারণেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। আবার সেই আগের মতোই যোগ্যতার নামে সীমিত এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেয়ার কথা বলায় ফের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্রেডিবল ও কোয়ালিফাইড রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করতে গিয়েই পূর্বের মতো সিন্ডিকেট তৈরি হবে। আর সিন্ডিকেট নয়, তা কোনো ভালো ফলাফল আনে না বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। 

তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ, অভিবাসীকর্মীদের ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল হওয়ায় নানা ঝুঁকি সত্ত্বেও মালয়েশিয়া এখনো বাংলাদেশি কর্মীদের প্রধান গন্তব্য। মূলত কলকারখানা, নির্মাণ শিল্প এবং কৃষি খামারে বাংলাদেশিদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গত বছরের আগস্টে মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছিল, দেশটিতে ৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি বৈধভাবে কাজ করছেন। এ সংখ্যা দেশটির মোট বিদেশি শ্রমশক্তির ৩৭ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি সই হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সে দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানি বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন।

নানা কারণে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হয়ে যায় শ্রমবাজারটি। কলিং ভিসা, নিয়োগানুমতি, বিএমইটির ছাড়পত্রসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। দুই দেশের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দুর্নীতি এবং কাজ ও বেতন না পাওয়াসহ নানা অভিযোগে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ রাখে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে একই কারণে সংকটের মুখে পড়ে শ্রমবাজারটি। তবে দুই দেশের সরকারের তৎপরতায় অল্প সময়ে তা খুলেও দেয়া হয়। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের যথাযথ কূটনৈতিক উদ্যোগের অভাবে দেশটির শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। ওই সময়ে দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দফায় দফায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সফরের পরও শ্রমবাজারটি খোলায় যায়নি। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও ঢালাও মামলার প্রভাবকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি গত জানুয়ারি থেকে শ্রমিক পাঠাতে পারলেও বাংলাদেশ থেকে পাঠানো সম্ভব হয়নি।

আরো পড়ুন : প্রসিকিউরের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে অনুসন্ধান কমিটি

তবে বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বড় বাংলাদেশর শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুদ্ধ পরিস্থিতি থাকায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় মালয়েশিয়ার বাজারে জোর দেয়া হয়। এ লক্ষ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহদি আমিন মালয়েশিয়া সফর করেন। গত ৯ এপ্রিল দেশটির পুত্রজায়ায় মানবসম্পদমন্ত্রী দাতো রমনন রামকৃষ্ণনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের শ্রম অভিবাসন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতার সঙ্গে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে দেশটি সম্মত হয়েছে বলে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়। শ্রমিক নিয়োগে মানবপাচার সংক্রান্ত অপ্রমাণিত মামলা ও চলমান তদন্ত নিস্পত্তিসহ বিভিন্ন শর্তে পুনরায় শ্রমবাজার খুলে দেয়ার কথাও বলা হয়।

সফর শেষে গত ১২ এপ্রিল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন সাংবাদিকদের জানান, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর যে সিন্ডিকেট রয়েছে, তা ভেঙে স্বল্প খরচে জনশক্তি রপ্তানিতে বিএনপি সরকার আন্তরিক। সিন্ডিকেট ভাঙার বিষয়ে আমরাই প্রথম- কয়েক দশক ধরেই এই বিষয়ে সরাসরি কথা বলে আসছি। আমরা চাই স্বল্প খরচে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যেন আমাদের কর্মীরা যেতে পারেন। মালয়েশিয়াকে আহ্বান জানিয়েছি এই প্রক্রিয়াটাকে সিন্ডিকেট মুক্ত করবার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, সেটি যেন করেন। এক্ষেত্রে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। তবে কবে থেকে শ্রমবাজারটি চালু হতে পারে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী কুয়ালালামপুরে সাংবাদিকদের বলেছেন, আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কাজের প্রতিফলন ঘটানো এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার আর আগের মতো নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আসছে। মালয়েশিয়া সব দেশের কর্মীদের জন্য একটি প্রযুক্তি-নির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)ভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিয়োগের যাবতীয় খরচ যাতে নিয়োগকর্তারাই বহন করেন তা নিশ্চিত করা।

এবারের শ্রমবাজার নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে বিশ্বাসযোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যা নির্দিষ্টসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমেই এই শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের বার্তা দেয়। পাশাপাশি শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর কথা এসেছে, যা বাস্তবায়ন দুরূহ ব্যাপার।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়া শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে একটা জিম্মি দশার মধ্যে আছে, এখনো সেই জিম্মি দশার দিকেই যাচ্ছে! এখনো সেই সিন্ডিকেটের দিকেই যাচ্ছে। কর্মী পাঠাতে ক্রেডিবল এবং কোয়ালিফাইড রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে যে, এখানে আবারো সিন্ডিকেট হওয়ারই একটা পাঁয়তারা চলছে। তিনি বলেন, ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার তৎকালীন মানবসম্পদমন্ত্রী সারাভানান ঢাকায় এসে শূন্য অভিবাসন খরচে কর্মী নেয়ার কথা বলেছিলেন। এর আগে ২০১৬ সালেও বলা হয়েছিল বিনা খরচে যাবে কর্মী। আসলে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সরকারকে ব্ল্যাক মেইল করে সিন্ডিকেট করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ফখরুল ইসলাম বলেন, তারা জিরো কস্টের (বিনা খরচ) মাধ্যমে লোক নিবে বলছে, কিন্ত এটা সম্ভব না। এটা হল ভাঁওতাবাজি। তারা জিরো কস্টের কথা বলে সীমিত এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত করতে চায়। আর এই মার্কেট উন্মুক্ত হলে আবারো টাকার বিনিময়ে আগের মতোই কর্মীদের জিম্মি করবে, শোষণ করবে, নির্যাতন করবে। এটাই তাদের কাজ।

বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, মালোশিয়ার অনেকগুলো স্টেটমেন্ট আছে। তারা সব দেশ থেকে যেভাবে কর্মী নিবে, বাংলাদেশের জন্য আলাদা সিস্টেম নাই, একইভাবে যাবে। তবে তাদের কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে, সব লাইসেন্সকে তারা সুযোগ দিবে না। তবে দেশটিতে লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে রিক্রটিং এজেন্সি নিয়োগের বিষয়টি বলা হয়েছে। তবে যদি যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়, সেখানে তো সিলেকটিভিটি আছে। সেটা যদি ট্রান্সপারেন্ট ওয়েতে হয়, তবে কারো কোনো আপত্তি থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, মালোশিয়ার সঙ্গে যে মিটিংটা হলো এটার পজিটিভ দিক। যুদ্ধের কারণে মধ্যেপ্রাচ্যের শ্রমবাজারটা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই যেহেতু মালয়েশিয়া আমাদের কর্মী নিতে আগ্রহী, সেক্ষেত্রে সরকার যথাযথভাবে এটাকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এটা আমরা এখানে একটা ভালো কিছু পাব।

অভিবাসী নিয়ে কাজ করা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, আমরা তো কোনো অবস্থায়ই চাইব না সিন্ডিকেশন হোক। আমরা বহুবার দেখেছি, সিন্ডিকেশন আসলে কোনো ভালো ফলাফল আনে না। সেক্ষেত্রে নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে কোনোরকম সিন্ডিকেশনের দিকে না যেতে। সেক্ষেত্রে যদি মার্কেট বন্ধ থাকে, তাতেও কিন্তু আমাদের ক্ষতি নেই।

এই অভিবাসী বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, এর আগে সিন্ডিকেশন করে লোক পাঠিয়ে তো রেমিটেন্সের উন্নতি হয়নি। মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্সের রেকর্ড ওই সময় খুব খারাপ ছিল। তাহলে আমি লোক পাঠিয়ে কি লাভ করব। শুধু শ্রমিক পাঠিয়ে ভাবব অনেক মানুষ গেছে- এটা ভাবলে তো চলবে না। সেটা সত্যিকার অর্থে তার অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে কিনা এটা তো অবশ্যই দেখতে হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

উত্তর আমেরিকায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’র নতুন রেকর্ড

উত্তর আমেরিকায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’র নতুন রেকর্ড

অবশেষে জয়ের মুখ দেখল রিয়াল মাদ্রিদ

অবশেষে জয়ের মুখ দেখল রিয়াল মাদ্রিদ

৩ মাসে সারা দেশে ৮৫৪ হত্যাকাণ্ড, ঢাকায় ১০৭

৩ মাসে সারা দেশে ৮৫৪ হত্যাকাণ্ড, ঢাকায় ১০৭

সৌদি পৌঁছেছেন ২০ হাজার ৫৫৩ হজযাত্রী, একজনের মৃত্যু

সৌদি পৌঁছেছেন ২০ হাজার ৫৫৩ হজযাত্রী, একজনের মৃত্যু

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App