বর্ষবরণ শোভাযাত্রার নাম বারবার বদল কেন?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলা নববর্ষের দিনে প্রতিবছর যে শোভাযাত্রা হয়, ফের সেটির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতদিন এটি 'আনন্দ শোভাযাত্রা' বা 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামে পরিচিত থাকলেও এবার থেকে এর নাম 'বৈশাখী শোভাযাত্রা' করার কথা জানিয়েছে সরকার।
সরকার বলছে, নাম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভাজন দূর করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আয়োজকরা বলছেন, সময়ের প্রেক্ষাপট ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে আয়োজনটি আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয়।
তাদের মতে, নামের পরিবর্তন মূল আয়োজনের উদ্দেশ্য বা তাৎপর্যকে বদলে দেয় না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টিকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তোলে।
যদিও সমালোচক ও বিশ্লেষকরা বলছেন উল্টো কথা। তাদের বক্তব্য হলো, একই আয়োজনের নাম বারবার পরিবর্তন করলে এর ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
'নাম পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় ব্যাপার, চাইলে করতেই পারে'
বাংলাদেশে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করা হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে এই পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত শোভাযাত্রা। এটি মূলত একটি বর্ণাঢ্য মিছিল, যার শুরুটা হয়েছে চারুকলা ইন্সটিটিউটের হাত ধরে।
১৯৮৯ সাল থেকে প্রতিবছর এই চারুকলা অনুষদ থেকে পহেলা বৈশাখের সকালে বাদ্যযন্ত্রের তালে বাঁশ-কাগজসহ নানা উপকরণে তৈরি নানা ধরনের ভাস্কর্য, মুখোশ হাতে বর্ণাঢ্য মিছিল বের হয়, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অনেকেই শামিল হন।
এটি 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামে খ্যাতি পেয়েছে, কিন্তু সাড়ে তিন দশক আগে যাত্রা শুরুর সময় ওই আয়োজনটির নাম ছিল 'আনন্দ শোভাযাত্রা'। পরবর্তীতে সেটির নাম পরিবর্তন করে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅঅভ্যুত্থানের পর গত বছর এর নাম 'আনন্দ শোভাযাত্রা' করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর ঠিক এক বছরের মাথায় ফের এর নাম পরিবর্তিত হয়ে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা' করা হলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নাম নিয়ে যা হচ্ছে তা "স্রেফ রাজনীতি"। কিন্তু মুশকিল হলো, এটার উদ্যোক্তা চারুকলা। তারা যদি এই নাম পরিবর্তনকে মেনে নেয়, তাহলে কিছু বলার থাকে না। তারা নাম দিয়েছিলো, তারাই এখন অন্য নাম গ্রহণ করছে। এখানে কিছু করার নাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সঙ্গে কথা বলেও দেখা গেছে, শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
অনুষদের ডিন ও নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, নাম পরিবর্তন করা হলেও "শোভাযাত্রার মূল আয়োজন ও কর্মকাণ্ডে নীতিগত কোনো বাধা নেই। আর নাম পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় ব্যাপার, চাইলে তো করতেই পারে"।
চারুকলা অনুষদ তাদের সাধ্যমতো উৎসবটিকে সুন্দরভাবে করার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এটি কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হলো, এতে কতটুকু বৈচিত্র্য এলো, দলমত নির্বিশেষে ধর্মনিরপেক্ষ উপস্থাপনা; বর্ষবরণ উদযাপনে এগুলোই চেতনার মূল জায়গা"। এই "মূল" জায়গাগুলোতে "কোনো সমস্যা নেই" বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ।
বারবার শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের বিষয়টিকে চারুকলা কীভাবে দেখছে জানতে চাইলে আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, "এটা আমাদের (চারুকলা) কাছে ঠিকঠাক লাগার প্রসঙ্গ না শুধু, এটি বৃহত্তর একটি রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম। আমরা আয়োজক। সবই ঠিক আছে"।
এখন বৃহত্তর কমিটি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য অংশীদার যারা আছে, সবার মতামতের আলোকে বৃহত্তর সিদ্ধান্ত এটি। কারো একক সিদ্ধান্ত বা মতামতের ব্যাপার নেই এখানে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যেভাবে সুবিধা হয় আর কি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, শোভাযাত্রার মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্য আছে কি না, এখানে সেটিই দেখার বিষয় শুধু।
নাম পরিবর্তনের পেছনে সরকারের যুক্তি
মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আগেও বিভিন্ন সময় বিতর্ক হতে দেখা গেছে। ধর্মভিত্তিক একাধিক গোষ্ঠী ও দলের সদস্যদের এই আয়োজনের বিরোধিতা করতেও দেখা গেছে।
চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে 'আনন্দ শোভাযাত্রা' নামে এই শোভাযাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে 'অমঙ্গলকে দূর করে মঙ্গলের আহ্বান' জানিয়েই শোভাযাত্রার নামকরণ হয় তখন 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই শোভাযাত্রাটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা 'ইউনেস্কো' ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর মঙ্গল শোভাযাত্রাকে 'অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
'মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ' – বাংলা বর্ষবরণের আয়োজনটিকে ইউনেস্কোর অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতির সনদে এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে কেন হঠাৎ করে ফের এই আয়োজনের নাম পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়লো এবং সরকার কেন চারুকলা আয়োজিত অনুষ্ঠানে জড়াতে গেল, এসব নিয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, "এই শোভাযাত্রা এককভাবে চারুকলার না। চারুকলা এটি প্রতিবছর আয়োজন করে। এটি সামগ্রিকভাবে একটি বৈশাখী উৎসব"।
২০২৫ সালের 'আনন্দ' শোভাযাত্রায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল 'ফ্যাসিবাদী মোটিফ'।
তিনিও উল্লেখ করেন যে ১৯৮৯ সালে চারুকলা এর নাম দেয় 'আনন্দ শোভাযাত্রা'। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে এর নামকরণ করে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'। এরপর গতবছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে এর নাম পাল্টে করে দেয় 'আনন্দ শোভাযাত্রা'।
"এখন এই আনন্দ আর মঙ্গল...সবকিছুই আনন্দ, সবকিছুই মঙ্গল...বৈশাখ একটি আনন্দঘন পরিবেশ। অথচ এই নামটা নিয়ে দু'টো পক্ষ হয়ে মারাত্মকভাবে একটি বিভাজন তৈরি হয়েছে। আমরা বিভাজন চাই না, অনৈক্য চাই না। আমরা ঐক্য ও বৈচিত্র্য চাই। বিভিন্ন জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে চাই। তাই, এটি অবসান করে আমরা নাম দিলাম বৈশাখী শোভাযাত্রা।"
মন্ত্রী বলেন, "দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছে"।
এদিকে, নাম বদলের ফলে জাতিসংঘের স্বীকৃতিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সেইসাথে, বাংলাদেশ সরকার এখন এ বিষয়ে কী করবে, জানতে চাইলে মন্ত্রী আরো বলেন যে জাতিসংঘকে এ বিষয়ে জানাতেই হবে, এমন কোনো বিষয় নেই; "তবে আমরা তাদেরকে জানিয়ে দিবো যে এখন শোভাযাত্রার নাম এটা। এটা এমন কিছু না"।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "তারা নবর্ষের উৎসবকে দিয়েছে। এর মাঝে অনেক কিছুই আছে। ওইদিন ঢাকায় রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান হয়, চারুকলা থেকে শোভাযাত্রা বের হয়। উদীচি অনুষ্ঠান করে, নজরুল ইনস্টিটিউট তাদের মতো অনুষ্ঠান করে"।
'সব ব্যাপারে সরকার মাথা গলালে সমস্যা'
চারুকলার এই শোভাযাত্রা বন্ধ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর চাপ বরাবরই ছিল। সে বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আপত্তির মূল কারণ ছিল, "এর মাঝে বিভিন্ন মোটিফ ব্যবহার করা হয়"।
"একদল লোক বললো, এটা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। তারপর গতবছর আনন্দ শোভাযাত্রা ফেরানো হলো। কিন্তু আনন্দ শব্দের মাঝেও চাইলে হিন্দুয়ানী গন্ধ পাওয়া যাবে। আর মঙ্গল হিন্দুয়ানী শব্দ মনে করলে মঙ্গলবার নামটাও পরিবর্তন করে দিতে হয়"। আর এই নাম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনীতি হয়েছে এবং এখনও সেটিই হচ্ছে বলে মত তার।
তাই, "আমি মনে করি, এখানে সরকারের মাথা গলানোর দরকার নাই। সব ব্যাপারে সরকার মাথা গলালে সমস্যা। ব্যাপারটা সেখানে। এটা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার মাঝে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী অন্য একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর রাজনীতির গন্ধ পান।"
"সেকারণ বর্তমান সরকার নিরাপদ অবস্থানে থাকার জন্য তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ নাম আবিষ্কার করলো। কিন্তু যারা এটিকে মঙ্গল বলে, তারা যদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে তখন এই নাম বদলে যাবে আবার। আমাদের এখানে হলের নাম বদলায়, পার্কের নাম বদলায়, বিমানবন্দরের নাম বদলায়, তখন নামও বদলে যাবে। এটা পিওর রাজনীতি," বলেন তিনি।
উল্লেখ্য, এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা চলছে। সেইসাথে, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনেকেই এ নিয়ে ইতোমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং তারা 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামটির পুনর্বহাল চাচ্ছে। অপরদিকে, পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন এক আইনজীবী।
সূত্র: বিবিসি
