দিল্লি সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কী অর্জন করতে চায় বিএনপি সরকার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৪ পিএম
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে ঢাকা থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা দেবেন খলিলুর রহমান। দিল্লিতে পৌঁছে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করবেন। খবর বিবিসি বাংলার।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, এই সফরের মাধ্যমে সেটি কমিয়ে এনে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায় ঢাকা। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তাও দিতে চায় বিএনপি সরকার।
সোমবার (৬ এপ্রিল) সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, হাসিনার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আর হবে না। হাসিনা এখন বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে নেই বললেই চলে। আওয়ামী লীগও কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্কের সূচনা । তিনিও এই সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দিল্লি যাচ্ছেন।
প্রায় ৪৮ ঘণ্টার এই সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর।
এই বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি, ভিসা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ফারাক্কা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।
ভারত সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একই ফ্লাইটে মরিশাস যাওয়ার কথাও রয়েছে খলিলুর রহমানের।
আরো পড়ুন : ১৭ মাস কোথায় ছিলেন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পথও সুগম করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়টিও এ আলোচনায় উঠে আসতে পারে।
দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের আয়োজনে আগামী ১১ এপ্রিল মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স। এই দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পোর্ট লুইসে যাওয়ার আগে তিনি ৪৮ ঘণ্টা ভারতে অবস্থান করবেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরর মতে, এ সফরকে একটি ট্রানজিট সফরও বলা যেতে পারে।
পরের দিন বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সফরকালে ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরীর সঙ্গেও আলোচনা করবেন তিনি। এছাড়া ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে, যদিও তা এখ নো নিশ্চিত নয়।
এই বৈঠকগুলো শেষে বৃহস্পতিবার সকালে পোর্ট লুইসের উদ্দেশে দিল্লি ত্যাগ করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জানা গেছে, তিনি এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একই বিমানে মরিশাস যাবেন, ফলে দীর্ঘ সাত-আট ঘণ্টার সফরে দুই মন্ত্রীর মধ্যে একান্ত আলোচনার সুযোগ থাকবে।
বিএনপি সরকার গঠনের প্রায় দেড় মাসের মাথায় এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে আনতে খোলামেলা আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।
উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা যত বেশি খোলামেলা সংলাপে যাব, ততই জটিল বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব হবে। তিনি আরো জানান, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা এবং জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হবে, যাতে অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
যদিও সফরের আলোচ্যসূচি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, অতীতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক নানা ইস্যুও আলোচনায় আসবে।
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি শুরু হয়েছে, ভবিষ্যতে এ সহযোগিতা আরো বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ভিসা ইস্যুও আলোচনায় আসতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভিসা প্রক্রিয়া সীমিত করা হলেও নতুন সরকার কিছু বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে, তবে ভারত এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি ফারাক্কা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। এর নবায়ন বা সংশোধন নিয়েও আলোচনা হতে পারে। এছাড়া সীমান্ত হত্যা বন্ধ, কানেক্টিভিটি প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বাণিজ্য সুবিধা পুনর্বহালের বিষয়গুলোও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
সম্পর্কের নতুন মোড়?
অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিতর্কিত নির্বাচনে ভারতের সমর্থন নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়াসহ নানা কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয় ভারত। এরই ধারাবাহিকতায়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন এস জয়শঙ্কর।
পরবর্তীতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। এসব ঘটনায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপির সাবেক এমপি এমজে আকবর বলেন, উভয় দেশই এখন উপলব্ধি করছে যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পরিবর্তন আনা জরুরি। দুই পক্ষই বুঝেছে, সাম্প্রতিক সময়ের সম্পর্কের অবনতি কারও জন্যই ভালো ছিল না। এখন সেটি বদলানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
