পাম্প মালিকদের ‘অঘোষিত রেশনিং’য়ে বিপাকে ক্রেতারা, নির্লিপ্ত সরকার
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সারাদেশে জ্বালানি তেলের অঘোষিত রেশনিং বা বিক্রির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও, মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে ঠিক উল্টো চিত্র। পাম্পগুলোতে নতুন এক রেশনিং পদ্ধতিতে সীমিত আকারে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে লম্বা সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সাধারণ ক্রেতারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে এ দৃশ্য দেখা যায়।
পাম্প মালিকরা নিজেদের সুবিধামতো একটি ‘অঘোষিত রেশনিং’ পদ্ধতি চালু করেছেন। এই পদ্ধতি অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে ১,৫০০ টাকার বেশি তেল বিক্রি করা হচ্ছে না। পাম্প কর্তৃপক্ষের এমন মনগড়া সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ ক্রেতারা। তেলের এই কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা নিয়ে পাম্পগুলোতে প্রতিদিন ক্রেতা ও কর্মীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি এবং নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে।
জিহাদ নামে এক ক্রেতা বলেন, ঈদে বাড়ি ফেরার আনন্দ নিয়ে মোটরসাইকেলে তেল নিতে এসেছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্প কর্তৃপক্ষ যা জানালো ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হবে না।
তিনি আরো বলেন, আমার গন্তব্য বগুড়া, যেখানে যাওয়ার জন্য কমপক্ষে ১০ লিটার তেলের প্রয়োজন। কিন্তু পাম্প মালিকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো নিয়ম তৈরি করে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তাদের এই 'মনগড়া পদ্ধতির কারণে আমাদের বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। সাধারণ যাত্রীদের এই দুর্ভোগের কি কোনো প্রতিকার নেই? প্রশাসনের কি উচিত নয় পাম্পগুলোর এই স্বেচ্ছাচারিতা তদারকি করা?
পাম্প মালিকদের দাবি, সরকারি ঘোষণা থাকলেও ডিপো থেকে চাহিদামতো সরবরাহ না পাওয়ায় তারা সাধারণ গ্রাহকদের কাছে পূর্ণমাত্রায় তেল বিক্রি করতে পারছেন না।
ডিলারদের মতে, ডিপো পর্যায়ে সরবরাহ না বাড়ানোয় সংকট কাটছে না। অনেকেই অভিযোগ করছেন, এখনও আগের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, ‘দীর্ঘদিন রেশনিং চালু থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। হঠাৎ করে তা স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাগজে-কলমে রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও বাস্তবে সরবরাহ এখনো সীমিত। এতে সাধারণ মানুষ ও পাম্প মালিক-উভয়ই ভোগান্তিতে পড়েছেন।’
এ বিষয়ে কথা বলতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান এবং বিপিসি সচিব শাহিনা সুলতানার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। এই সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের বাজারেও জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির করে অধিক মুনাফার আশায় এক শ্রেণির পাম্প মালিক, ডিলার ও বিক্রেতারা অবৈধভাবে তেল মজুত করছিলো। এমনকি সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও তেলের মজুত করার এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে গত (৬ মার্চ) থেকে সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছিলো। এর পরে রোববার (১৫ মার্চ) বাংলাদেশে জ্বালানি তেল (পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল) ক্রয়ে চলমান রেশনিং বা বিধিনিষেধ ব্যবস্থা তুলে নেয় সরকার।
