শিমুল–পলাশের রঙে বসন্তের রঙিন আয়োজন, নতুন ভেন্যুতে প্রাণের উচ্ছ্বাস
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
শিমুল–পলাশের রঙে লাল বসন্তের প্রথম সকাল গানের সুর আর নৃত্যের ছন্দে মুখর হয়ে উঠেছিল রাজধানী। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণ ঋতুরাজের আগমনী দিনে প্রাণের উচ্ছ্বাসে স্পন্দিত হয়। ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ আহ্বান নিয়ে ৩৮তম বারের মতো বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে জাতীয় বসন্ত উদ্যাপন পরিষৎ।
সকাল ৮টায় বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের সমবেত যন্ত্র ও কণ্ঠসংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের একক সংগীত, আবৃত্তি, দলীয় সংগীত ও নৃত্যের ধারাবাহিক পরিবেশনা অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা, বিশেষ করে নৃত্যশিল্পীরা, এসেছিলেন বর্ণিল সাজে। দর্শকেরাও অংশ নেন বসন্তের ঐতিহ্যবাহী সজ্জায়। নারীদের পরনে ছিল বাসন্তী রঙের ছাপা শাড়ি ও ফুলের অলংকার, আর পুরুষদের অনেকেই পরেছিলেন উজ্জ্বল রঙের পাঞ্জাবি। শীতের আমেজ কাটিয়ে ওঠা রাজধানীতে গরম পোশাকের প্রয়োজন না থাকায় আবালবৃদ্ধবনিতা উৎসবের রঙে নিজেদের সাজিয়ে তোলেন।
অনুষ্ঠানের অধিকাংশ গান, আবৃত্তি ও নৃত্য ছিল বসন্তকে ঘিরে। ভালোবাসার ঋতু হিসেবে বসন্তের আবহে প্রেমের গানও পরিবেশিত হয়। দর্শক–শ্রোতাদের অনেকে শিল্পীদের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন, আবার কেউ কেউ নৃত্যের তালে তাল মিলিয়েছেন।
জাদুঘরের প্রথম তলার খোলা পরিসরে মঞ্চ তৈরি করা হয় এবং দর্শকদের জন্য সারি দিয়ে চেয়ার পাতা ছিল। তবু দর্শকের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে অনেকে দাঁড়িয়ে কিংবা সিঁড়িতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। কেউ কেউ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন, আবার অনেকেই ক্যাফেটেরিয়ার সামনে চা পান ও আড্ডায় মেতে ওঠেন। সব মিলিয়ে নতুন স্থানে বসন্ত উৎসবটি হয়ে ওঠে আনন্দঘন আয়োজন।

বসন্ত উৎসবের সূচনা হয়েছিল ১৪০১ বঙ্গাব্দে (১৯৯২ সালে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়। দীর্ঘদিন সেখানেই এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হলেও সাম্প্রতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার সেখানে অনুমতি পাওয়া যায়নি। আয়োজকেরা বিভিন্ন স্থানে আয়োজনের চেষ্টা করেও অনুমতি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে উৎসব আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন।
জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষৎ–এর সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী বলেন, এবারই প্রথম চারুকলার বকুলতলার বাইরে উৎসব আয়োজন করতে হয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ দেশের শিকড় এবং বসন্ত উৎসবের মতো ঋতুভিত্তিক আয়োজনও আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত। তাই এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করতে পেরে তাঁরা আনন্দিত। আগামী বছর আবার বকুলতলাতেই উৎসব করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংগঠনের সহসভাপতি কাজল দেবনাথ বলেন, এই আয়োজন সংস্কৃতি অঙ্গনে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। পরিবেশ আরো উন্মুক্ত হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জনমনে ভীতি ও অনিশ্চয়তা থাকলেও তিন দশকের বেশি সময়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। তেমন প্রচার ছাড়াই বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে উৎসব সফল হওয়ায় তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ নিরাপদ রাখতে সরকারের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে একক সংগীত পরিবেশন করেন বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি, তানজিলা তমা, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, শ্রাবণী গুহ রায়, সুস্মিতা সূচি, মারুফ হোসেন এবং রীতা রানী সাহা। অনিমা রায়ের নেতৃত্বে দলীয় পরিবেশনা ছিল ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’।
সম্মেলক সংগীত পরিবেশন করে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী এবং বহ্নিশিখা। কবি আসাদ চৌধুরীর ‘ফাল্গুন এলো’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন নায়লা তারান্নুম।

নৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দ, কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন সংগঠন। এছাড়া গৌড়ীয় নৃত্য একাডেমি, নবচেতনা, গারো কালচারাল একাডেমি, তুরঙ্গমী, নন্দিনী নৃত্যালয়, জাগো আর্ট সেন্টার, বাংলাদেশ একাডেমি অব পারফর্মিং আর্ট, সাধনা, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্রসহ আরও অনেক সংগঠন অংশ নেয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নায়লা তারান্নুম চৌধুরী ও আহসান দিপু।
বসন্ত উৎসবের পৃষ্ঠপোষক ছিল ইস্পাহানি গ্রুপ। দর্শকদের জন্য চা পরিবেশন করা হয় তাদের উদ্যোগে। প্রতিষ্ঠানের উপমহাব্যবস্থাপক এইচ এম ফজলে রাব্বি বলেন, বসন্ত উৎসবের শুরু থেকেই তারা এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। ঋতুভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক এই উৎসব এবং ভালোবাসা দিবসের আবহ মিলিয়ে এমন সাংস্কৃতিক আয়োজনের অংশ হতে পেরে তারা আনন্দিত।
দুপুর পর্যন্ত চলা এই উৎসবে একক সংগীত পরিবেশন করেন আরো কয়েকজন শিল্পী—ফাহিম হোসেন চৌধুরী, মহাদেব সাহা, আবিদা রহমান, ফেরদৌসী কাকলি, সেমন্তী মঞ্জুরি, অবিনাশ বাউল ও সঞ্চিতা রাখী। আবৃত্তি করেন বেলায়েত হোসেন।
সব মিলিয়ে নতুন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত এবারের বসন্ত উৎসব হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলার এক উজ্জ্বল আয়োজন।
