জলাবদ্ধতায় ডুবল ২০২ হেক্টর বোরো ধান
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ময়মনসিংহের নান্দাইলে চলতি বোরো মৌসুমে চাষ করা ৯৩৫ হেক্টর জমির ফসল নিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। টানা ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলার প্রায় ২০২ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৭০৫ হেক্টর জমির ফসল।
সরেজমিনে উপজেলার আচারগাঁও, নান্দাইল, গাংগাইল, রাজগাতি, বেতাগৈর ও চরবেতাগৈরসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায় কৃষকদের করুণ চিত্র। তলিয়ে যাওয়া আধাপাকা ধান রক্ষায় কৃষকরা জানপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। কাউকে হাঁটু সমান পানিতে, কাউকে বুক সমান পানিতে নেমে, আবার কাউকে নৌকা বা ভেলায় করে ধান কাটতে দেখা গেছে। তবে অনেক কৃষককে ফসলের দিকে তাকিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
কৃষকদের অভিযোগ, একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন ও পানি নিষ্কাশনের পথে কৃত্রিম বাঁধ দেওয়ায় এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা বিলে ও খালে মাছ ধরার জন্য আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারছে না। এছাড়া ফসলি জমিতে যত্রতত্র পুকুর খনন করায় পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট, যার ফলে বুক সমান পানিতে তলিয়ে যাওয়া কয়েকশ কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উলুহাটি গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, ধান কাটার জন্য শ্রমিক না পাওয়ায় ও আগাম বৃষ্টিতে আমাদের ক্ষেতের ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে আমাদের সব শেষ হয়ে যায়।
ভাটি সাভার গ্রামের আজিজুল হক বলেন, একদিকে ধান কাটার শ্রমিকের সংকট, অন্যদিকে এই সুযোগে কম্বাইন্ড হারভেস্টার চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। ফলে দ্বিগুণ তীর মুখে পড়েছেন তারা। পাশাপাশি জলাবদ্ধতার কারণেও পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় আমাদের উৎপাদিত ধান ঘরে তুলতে পারছি না। এতে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে নান্দাইল উপজেলায় ৯৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দুর্যোগে ২০২ হেক্টরের বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নান্দাইল উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক বাবুল বলেন, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করা কৃষকরা এখন দিশেহারা। জলাবদ্ধতার জন্য অবৈধ বাঁধ ও অপরিকল্পিত পুকুরই প্রধান দায়ী। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি জানান।
এ বিষয়ে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন জানান, বিল বা জলাশয়ে পুকুর নির্মাণে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পানি প্রবাহ বন্ধ করে অবৈধভাবে কেউ বাঁধ দিলে বা পুকুর নির্মাণ করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈমা সুলতানা বলেন, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ২০২ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে করে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৪ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা নির্ধারিত করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে গেলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। কৃষকরা যাতে অবশিষ্ট ধান কেটে দ্রুত ঘরে তুলতে পারেন, সেজন্য মাঠ পর্যায়ে তাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
