বিশ্বের এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ব্যয়বহুল জলপথ হরমুজ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
ফাইল ছবি
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি এখন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ও ব্যয়বহুল জলপথে পরিণত হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মাইন আতঙ্ক ও নৌসেনাদের উপস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ রুটটি দিয়ে পণ্য পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধের প্রভাবে প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বীমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকির বিপরীতে প্রিমিয়ামের হার ২০০-৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। খবর ইউরো নিউজ।
বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচল স্থগিত হওয়ার প্রভাব আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।
পারস্য ও ওমান উপসাগর সংযুক্তকারী সরু জলপথটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের ৩০ শতাংশ এ পথ দিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধে প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এ রুট।
যুক্তরাজ্যের চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের পরিচালক মার্কো ফরজিওন জানান, একসময়ের সংবেদনশীল এলাকাটি এখন স্থায়ীভাবে একটি বৈরী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এখানে এখন জাহাজ চালানো ও বীমাকারীদের সম্মতি পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ‘ওয়ার রিস্ক’ বা যুদ্ধকালীন বীমা প্রিমিয়াম নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ফরজিওন জানান, বীমা সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার পর এখন ঝুঁকি প্রিমিয়াম ২০০-৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংকটের আগে একটি জাহাজের বীমা খরচ ছিল তার মোট মূল্যের দশমিক শূন্য ২ শতাংশ থেকে দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ বা তার বেশি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১২ কোটি ডলার মূল্যের একটি ট্যাংকারের জন্য আগে যেখানে ৪০ হাজার ডলার বীমা খরচ দিতে হতো, এখন এক ট্রিপের জন্যই খরচ হচ্ছে ৬-১২ লাখ ডলার। বাড়তি এ খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই কাটা যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান অভিমুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি এখন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এ উত্তপ্ত পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব নৌবাণিজ্যে। ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বীমা কোম্পানিগুলো ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজের পলিসি সুবিধা বাতিল করছে এবং প্রিমিয়ামের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এতদিন পারস্য উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বীমা খরচ ছিল একটি জাহাজের মোট প্রতিস্থাপন মূল্যের প্রায় দশমিক ২৫ শতাংশ। বীমা ব্রোকার প্রতিষ্ঠান মার্শের ইউকে ওয়ার লিডার ডিলান মর্টিমার জানান, এ বীমা মাশুল এখন আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক (৫০ শতাংশ) পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি সুপারমার্কেটের পণ্যের দামও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মায়ের্স্ক, এমএসসি, সিএমএ সিজিএম ও হ্যাপাগ-লয়েডের মতো বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানি এ পথে যাত্রা স্থগিত করেছে। অনেক কোম্পানি বিকল্প পথ ব্যবহার করছে, ফলে গন্তব্যে পৌঁছতে অনেক বেশি সময় লাগছে। নেপচুন পিটুপি গ্রুপের গোয়েন্দা ও ঝুঁকিবিষয়ক পরিচালক ক্রিস্টোফার লং জানান, কোম্পানিগুলো এখন পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে এবং জাহাজের কর্মীদের বাড়তি সতর্কতামূলক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
ফরজিওন সতর্ক করে বলেন, ‘পারস্য উপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রুট পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত। তাই ব্যবসায়ীদের জন্য এখন সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো একটি জরুরি কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি মাত্র উৎসের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করলে এ ধরনের ধাক্কা সামলানো সহজ হয়। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা থাকলে দুর্বলতাগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব।’
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬টি জাহাজ আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে নৌ-এসকর্ট বা পাহারার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশকে নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এসকর্ট জাহাজ থাকলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না।
সাবেক ব্রিটিশ নৌ কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার লং মনে করেন, নিরাপত্তাবাহিনী থাকলেও কোম্পানিগুলো হরমুজকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেই দেখবে।
অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিশ্বজুড়ে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করার পরামর্শ দেন। নতুন বাজার এবং বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পাওয়াই বর্তমান অস্থির সময়ে টিকে থাকার একমাত্র পথ।
