পীর হত্যায় সপ্তাহ পেরিয়েও গ্রেপ্তার শূন্য
এস আর সেলিম, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আলোচিত ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজা (৫২) হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পেরোলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত কোনো আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। দরবার শরিফে হামলা, ভাঙচুর ও সেখানকার 'পীর' হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ বলছে, আসামিদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে মামলার তদন্তে অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
পবিত্র কোরআন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে গত ১১ এপ্রিল দুপুরের দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিনগর এলাকায় কথিত পীর শামীম রেজার দরবার শরিফে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। এ সময় বিক্ষুব্ধরা দরবারের দোতলার একটি কক্ষ থেকে শামীম রেজাকে বের করে এনে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেন। বিক্ষুব্ধদের হাতে শামীমের দুই অনুসারী আহত হন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাবের টহলের পাশাপাশি বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হলেও এখনো সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ময়নাতদন্ত শেষে পরের দিন ১২ এপ্রিল বিকালে ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিনগর এলাকার কবরস্থানে 'পীর' আব্দুর রহমান শামীমকে দাফন করা হয়। যদিও শামীমের ইচ্ছা অনুযায়ী ভক্ত-অনুসারীরা তাকে নিজের প্রতিষ্ঠিত 'কালান্দার বাবা শ্রী শামীমজাহাঙ্গীর দরবার শরিফ' নামক দরবার শরিফে সমাহিত করার দাবি জানালেও পুনরায় সহিংসতার আশঙ্কায় পরিবার, এলাকাবাসী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা নাকচ করে দেয়া হয়।
শামীম হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবার মামলা করতে অসম্মতি জানিয়ে আসলেও পরে তারা 'পুলিশের চাপে' সিদ্ধান্ত বদলান। হত্যাকাণ্ডের তিন দিনের মাথায় ১৩ এপ্রিল রাতে নিহত আব্দুর রহমান শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র মতে, ভিডিও ফুটেজে চিহ্নিত স্থানীয় জামায়াতকর্মী ও পেশায় কাঠমিস্ত্রি রাজিব নামে এক ব্যক্তিকে প্রধান আসামি করে এবং ১৮০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলার এজাহার জমা দেয়া হয়। সেই মোতাবেক নিয়মিত আপডেট দেয়া একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের অনলাইন ভার্সনে তাৎক্ষণিক খবরও বের হয়। তবে রাতেই এজাহার পরিবর্তন করে আরো তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট চারজনের নাম-পরিচয় উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়। এতে ফিলিপনগর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের কালাম দফাদারের ছেলে স্থানীয় জামায়াত নেতা মো. খাজা আহম্মেদকে (৩৮) প্রধান আসামি করা হয়। তিনি জেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা জামায়াতের বর্তমান কর্মপরিষদ সদস্য।
এজাহারভুক্ত অপর তিন আসামির মধ্যে ২ নম্বরে রয়েছেন, উপজেলার হোসেনাবাদ (বিশ্বাসপাড়া) গ্রামের মৃত এরশাদ আলীর ছেলে মো. আসাদুজ্জামান (৩৫)। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের দৌলতপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি। আসামি তালিকায় ৩ নম্বরে রয়েছেন, পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর দারোগার মোড় এলাকার গাজী মিস্ত্রীর ছেলে স্থানীয় জামায়াতকর্মী কাঠমিস্ত্রি রাজীব (৪৫) এবং ৪ নম্বর আসামি হলেন, ইসলামপুর (পূর্বপাড়া) গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক মো. শিহাব উদ্দিন।
গণমাধ্যমে আসা খবরে বলা হয়, মামলার বাদী ফজলুর রহমানের মোবাইলে কল দিয়ে মামলার আসামিদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না।’ এরপর ‘এত প্রশ্নের উত্তর এখন দিতে পারব না' বলে কল কেটে দেন। তবে বাদীর এমন দাবি সত্য নয় জানিয়ে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘এটা সত্য নয়। তিনি স্বাক্ষর করেছেন বলেই মামলা হয়েছে। এজাহার পড়েই স্বাক্ষর করেছেন। এমনকি দুই ভাইসহ দীর্ঘ সময় তিনি থানায় উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়রা বলছেন, পবিত্র কোরআন অবমাননা ও একের পর এক ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কারণে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগায় দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওইদিন (১১ এপ্রিল) কথিত পীর আব্দুর রহমান শামীমের দরবার শরিফে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় শামীমকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এলাকাবাসী।
আলোচিত ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজা হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও, হত্যাকাণ্ডে জড়িত কোনো আসামিকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে না পারায় 'পীরের' ভক্ত-অনুসারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ তাদের কেন গ্রেপ্তার করছে না, সেটা বোধগম্য নয়। 'পীরের' দরবারে হামলার ঘটনায় ধর্মভিত্তিক দলের নেতাকর্মীরা ছাড়াও অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে ভিডিও ফুটেজ দেখে অনেকে জানিয়েছেন।
অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দরবার শরিফ সংলগ্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন 'পীর' ভক্ত-অনুসারীরা। অন্যদিকে মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে প্রতিবাদে একই দিন দৌলতপুর থানার সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ সময় জামায়াত নেতারা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মীদের জড়ানোর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মামলার এজাহার থেকে নেতাকর্মীদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে, 'পীরের' মরদেহ কবরস্থান থেকে উত্তোলন করে দরবার শরিফের ভেতরে সমাহিত করা হবে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর এলাকায় কবরস্থানও দু-দিন ধরে পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। তবে ভক্ত-অনুসারীরা কবর থেকে তাদের 'পীরের' মরদেহ উত্তোলন ও দরবারে সমাহিত করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তারা বলেন, 'এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। বাবাকে ('পীর') যারা হত্যা করেছে তারাই মূলত এই গুজব ছড়িয়ে হত্যার ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। আমরা চাই হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।'
অন্যদিকে পবিত্র কোরআন অবমাননার যে ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় এলাকাবাসী 'পীরের' প্রতি নতুন করে ক্ষুব্ধ হন, সেই পুরনো ভিডিওটিতে বাউলশিল্পী শফি মণ্ডলকে দেখা যায়। এ কারণে হামলার আশঙ্কায় শফি মণ্ডলের আখড়াবাড়িতেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, কথিত পীর আব্দুর রহমান শামীম দরবার শরিফের সিংহাসনে বসে পবিত্র কোরআন অবমাননাকর মন্তব্য করছেন। বাউলশিল্পী শফি মণ্ডল 'পীরের' পাশাপাশি নিচের দিকে বসে মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছেন। পেছন দিক থেকে একজন লাল রঙের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। শফি মণ্ডলের পাশে এবং সামনের দিকে আরো কয়েকজন নারী-পুরুষকে বসে থাকতে দেখা যায়। এছাড়া অপর একটি ভিডিওতে শফি মণ্ডলকে দরবার শরিফের আসর মাতিয়ে গান গাইতে দেখা গেছে। তবে বাউলশিল্পী শফি মণ্ডল জানান, 'পীরের' ভক্ত কিংবা অনুসারী হয়ে নয়, পেশাগত কারণে তিনি ওই দরবারে গিয়েছিলেন।
দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, মামলার আসামি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। নিহতের বড় ভাইয়ের দেওয়া এজাহারের ভিত্তিতে মামলা এন্ট্রি করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে মামলার তদন্তে অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। নতুন কোনো সহিংসতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
প্রসঙ্গত, শামীম রেজা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করে রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে ঢোকেন। পাশাপাশি শোবিজের প্রতিও ঝুঁকে পড়েন। চাকরিরত অবস্থায় তার বিয়ে হলেও বেশিদিন তাদের সংসার টেকেনি। পরে চাকরি ছেড়ে শেয়ার ব্যবসায় যুক্ত হন। সেখানেও গচ্ছিত অর্থ ও সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। এ অবস্থায় বিয়ের দেড় বছরের মাথায় স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। সর্বশান্ত হয়ে দিশাহারা শামীম আধ্যাত্মিক চর্চা শুরু করেন। কেরানীগঞ্জের ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং তার দরবার শরিফে খাদেমের দায়িত্ব নেন। করোনাকালে শামীমের পীর 'কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী' মারা গেলে তিনি প্রায় দেড় যুগ পর এলাকায় ফিরে আসেন। তিনি পৈত্রিক জমিতে দরবার শরিফ চালু করে নিজের মতো করে ইসলাম ধর্ম বিকৃত করে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। ধর্ম নিয়ে জগাখিচুড়ি অবস্থান ছিল 'পীর' শামীমের। তিনি কখনো নিজেকে 'বাংলার নবী', কখনো 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণ' আবার কখনো 'যীশুখ্রিস্ট' দাবি করতেন বলে জানান এলাকাবাসী। এর আগে ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। মাস তিনেক পর জেল থেকে বেরিয়ে বেশভূষা পরিবর্তন করে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন।
