রেহমান সোবহান
ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশে সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রধান চ্যালেঞ্জ ব্যক্তি নয়, বরং কাঠামোগত—এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, ঋণখেলাপিরা এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারাই সংস্কারের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। তাই সংস্কারকে শুধু আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি ধারাবাহিক ও বহুস্তর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
রোববার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নবম বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিনে ‘সংস্কার নিয়ে মোহ: বাংলাদেশের গল্প’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পরিবর্তিত বিশ্বে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং নীতিগত পদক্ষেপ’। অধিবেশনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সেলিম রায়হান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং আলোচক হিসেবে ছিলেন সাবেক অর্থসচিব ও মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।
- আইন নয়, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
রেহমান সোবহান বলেন, সংস্কার মানে কেবল নতুন আইন করা নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ফলাফল মূল্যায়ন। তার মতে, আইন পাস করা তুলনামূলক সহজ হলেও বাস্তবায়নই সবচেয়ে কঠিন ধাপ।
তিনি আরও বলেন, সংস্কারকে অনেক সময় তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করতে প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো অপরিহার্য।
- রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃঢ় নেতৃত্ব ও অঙ্গীকারের অভাব স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রেই দলের সদস্যরা নিজেদের ইশতেহার সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন না।
অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বড় ধরনের সংস্কার তখনই সফল হয়েছে, যখন তা জনগণের শক্তিশালী সমর্থন পেয়েছে। তিনি ছয় দফা আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরি করেছিল। বর্তমানে এ ধরনের গণভিত্তিক উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
- আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রস্তাব নিয়ে মন্তব্য
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংস্কার প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো নতুন কিছু নয়; দীর্ঘদিন ধরেই একই ধরনের সুপারিশ দিয়ে আসছে এসব সংস্থা। অনেক সময় সরকার ঋণের কিস্তি পাওয়ার লক্ষ্যে আংশিক অগ্রগতি দেখালেও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। একইভাবে উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থ বিতরণের লক্ষ্য পূরণে নির্দিষ্ট ধরনের সংস্কার এগিয়ে নিতে আগ্রহী থাকে।
- বিচার, বাজেট ও প্রশাসনিক সংস্কারে ধীরগতি
বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে তিনি বলেন, ১৯৯০-এর দশকে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সীমিত। রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট একীভূত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
পারফরম্যান্সভিত্তিক বাজেট ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এতে জনগণ জানতে পারবে সরকারি ব্যয়ের বিপরীতে কী ফলাফল অর্জিত হচ্ছে। বর্তমানে ব্যয়ের হিসাব থাকলেও তার কার্যকারিতা বিশ্লেষণের ঘাটতি রয়েছে।
- স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যবস্থাপনার সংকট
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় পুরো অর্থ ব্যবহার করা হয় না, আবার একই সঙ্গে বরাদ্দ কম হওয়ার অভিযোগও শোনা যায়। এতে বোঝা যায়, সমস্যা শুধু অর্থের পরিমাণে নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে।
তিনি বলেন, জনগণ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরীক্ষার ফল ভালো হলেও বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট।
- নাগরিক সমাজ ও বিরোধী দলের ভূমিকা
ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে খাদ্য, শিক্ষা ও কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বিভক্ত থাকায় বড় ধরনের সংস্কারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ চাপ তৈরি করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তাদের শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, বরং সরকারের কার্যক্রমে নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
- গণতন্ত্রই সংস্কারের মূল ভিত্তি
সংস্কারের সফলতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে রেহমান সোবহান অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, একটি সরকার তখনই জবাবদিহিমূলক হয়, যখন তারা জনগণের রায়ের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকে।
তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই বলেও মন্তব্য করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশে সংস্কার কার্যক্রম সফল করা কঠিনই থেকে যাবে।
