অপরিকল্পিত ড্রেনেজে জলাবদ্ধ রংপুর
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রংপুর নগরীতে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এতে সড়ক, অলিগলি ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। শ্যামাসুন্দরী ও কেডি ক্যানেলের পানি বেড়ে যাওয়ায় নগরীর বিভিন্ন ব্যস্ত সড়ক ও নিম্নাঞ্চলেও হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুরে ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর গত এক সপ্তাহে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০৮ মিলিমিটার।
গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে তিস্তা, ঘাঘট ও যমুনেশ্বরী নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানি বাড়ার কারণে নদীভাঙনও দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের অনেক নিচু এলাকা এখন পানিতে থইথই করছে। কোথাও হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। নগরীর বাবুখা, মাস্টারপাড়া, আবহাওয়া অফিস এলাকা, চারতলা মোড় কলোনী, লালবাগ, পার্কের মোড়, মেডিকেল ক্যাম্পাস, নীলকণ্ঠ, সোটাপীর ও শান্তিবাগসহ অন্তত ১০টি এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে।
কিছু এলাকায় ড্রেন উপচে ময়লা পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়েছে। পানি দ্রুত নামতে না পারায় অনেক স্থানে এখনও বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে রয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজ করলেও স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী। তাদের মতে, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শ্যামাসুন্দরী ও কেডি ক্যানেল খনন ও সংস্কার জরুরি।
ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, নগরীর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ শ্যামাসুন্দরী ক্যানেল নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
চারতলা মোড় কলোনীর বাসিন্দা হোসেন মিয়া বলেন, রংপুর বিভাগীয় শহর হলেও তা বুঝে ওঠা কঠিন। কোথাও রাস্তার চেয়ে ড্রেন নিচু, আবার কোথাও খালের চেয়ে রাস্তা নিচু। পুরো নগরটাই অগোছালো, তাই সামান্য বৃষ্টিতেই ভোগান্তি বাড়ে।
মাস্টারপাড়ার দারুল ইসলাম হাফেজিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, এ এলাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। অল্প বৃষ্টিতেই মাদরাসায় পানি ঢুকে শিক্ষার্থীদের কক্ষ ডুবে যায়। বাধ্য হয়ে তাদের অন্যত্র রাখতে হয়।
বাবুখা এলাকার বাসিন্দা আহসান হাবিব বলেন, পর্যাপ্ত ড্রেন না থাকা এবং খাল দখল হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিলেও বাস্তবে পরিবর্তন নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবই এ সমস্যার মূল কারণ। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, পরিকল্পিত নগর গড়তে দীর্ঘদিনেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন পরিকল্পনা ঝুলে আছে এবং মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই নগরায়ণ চলছে।
তিনি আরও বলেন, একটি আধুনিক শহরের জন্য পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা জরুরি। রংপুরকে আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, দেশের অন্যতম অপরিকল্পিত নগরের একটি রংপুর। ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ৩৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিতে পুরো শহর ডুবে যাওয়ার ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। তার মতে, শ্যামাসুন্দরী ও কেডি ক্যানেলের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্তকরণ ও সংস্কার না হওয়ায় বারবার জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, যেভাবে সড়ক নির্মাণে যানজট কমানো হয়, ঠিক তেমনভাবে ড্রেনেজ পরিকল্পনাও করতে হবে। এজন্য একটি কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান জরুরি।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (দায়িত্বরত) রাকিব হাসান জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৪ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলেও তিনি পূর্বাভাস দেন।
