নিষিদ্ধ সুরের গল্প…
মো: মনজুর আহমেদ
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
নিষিদ্ধ সুরের গল্প…
একটি ২ বা ৩ বছরের শিশুকে হামাগুড়ি দেওয়ার সময় অভিভাবকরা তাকে যেদিকে যেতে নিষেধ করেন, শিশুটি সেদিকেই যেন বেশি যেতে চায়। শিশু থেকে কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে যখন মানুষ পূর্ণবয়স্ক হয়, তখনও তার একই প্রবণতা থাকে। নিষিদ্ধ বিষয়ের উপর আকর্ষণ। ডায়াবেটিস রোগীর বিভিন্ন খাবার আর মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ, ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে ফাঁকি দেওয়া প্রবণতা বা নাগরিকদের দেশের প্রচলিত আইন মেনে না চলার ইচ্ছা-ই যেন মানুষের মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকে। নিষিদ্ধ জায়গায় যাওয়া বা নিষিদ্ধ বই খুঁজে বের করে পড়ার প্রবল ইচ্ছা তো থাকেই, আর সেটি যদি হয় সংগীত, তাহলে তো কথা-ই নেই। নিষিদ্ধ গান বা শিল্পী মানুষের মনে কতটা প্রভাব বিস্তার করে সেটি আমরা একটু জানার চেষ্টা করি।
১৯৮৮ সালে প্রকাশ পায় N.W.A (Niggaz With Attitude) এর হিপহপ গান “Fuck tha Police”। N.W.A এর এই দলে ছিলেন Dr. Dre, যার আসল নাম Andre Romelle Young, Ice Cube যার আসল নাম ছিলো O'Shea Jackson, Eazy-E, তার আসল নাম ছিলো Eric Lynn Wright, অন্য সদস্য MC Ren, আসল নাম Lorenzo Jerald Patterson এবং DJ Yella যার আসল নাম ছিলো Antoine Carraby। তাদের হিপহপ গানটির লিরিকে সরাসরি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় বর্ণবাদ, নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহার এর। যুক্তরাষ্ট্রের বহু রেডিও স্টেশন গানটি নিষিদ্ধ করে। FBI রেকর্ড কোম্পানিকে সতর্কবার্তাও পাঠায়। এমনকি কনসার্টেও গানটি গাইতে বাধা দেওয়া হয়। নিষিদ্ধ হওয়ার পরই গানটি তরুণ সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে এটি।
জনপ্রিয় ব্রিটিশ ব্যান্ডদল "The Beatles"। যে দলের সদস্য ছিলেন John Lennon, Paul McCartney এর মতো বিখ্যাত শিল্পীরা। তাদের একটি গানের শিরোনাম ছিলো “A Day in the Life", BBC (British Broadcasting Corporation) গানটি নিষিদ্ধ করে। তাদের অভিযোগ ছিলো গানের লিরিকে ড্রাগ ব্যবহারের ইঙ্গিত রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং আজ তা ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত।
বিশ্বখ্যাত পপ তারকা Madonna-র একটি গানের শিরোনাম ছিলো "Like a Prayer", এই গানটি ধর্মীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি ওঠায়, কিছু দেশে গানটি সীমিত করা হয়, এবং এই বিতর্কই গানটিকে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ভারতীয় উপমহাদেশ এর বিখ্যাত শিল্পী কিশোর কুমার। তাঁরও বিখ্যাত এবং তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পিছনে তাঁর দৃঢ় মানসিকতার একটি উদাহরণ রয়েছে। ১৯৭৫ সালে ভারত সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। সে অবস্থার প্রতিবাদ স্বরূপ কিশোর কুমার সরকারি অনুষ্ঠানে গান গাইতে অস্বীকৃতি জানান। এ কারণে সে সময়ের ভারত সরকার তাঁর গান অল ইন্ডিয়া রেডিওতে নিষিদ্ধ করে। রেডিওতে বন্ধ করা হলেও তাঁর গান মানুষের মধ্যে আরও ছড়িয়ে পড়ে। অডিও
ক্যাসেটের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা বা গানগুলো কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছে সেটি আমরা সবাই জানি। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বা এতে প্রচারিত গানগুলো নিষিদ্ধই ছিলো। পাক বাহিনীর অত্যাচারে এগুলো লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতে হতো। কিন্তু পাক সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাংলার জনতা কীভাবে "জয় বাংলা, বাংলার জয়" অথবা " মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি" গানগুলো ধারণ করেছিল এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেটি আমরা সবাই জানি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সরাসরি নিষিদ্ধ গানের নজির কম। তবে রাজনৈতিক পালা বদলের কারণে সবসময়ই কিছু গান মূলধারার বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু শ্রোতার মনের বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ব থেকে বাংলাদেশ, সব জায়গায় একটাই চিত্র স্পট, গানকে থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু গান থামেনি, বরং নিষিদ্ধ গানই আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ গোপনে শুনেছে। আসলে জন্মগতভাবেই মানুষের নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি যে প্রবল আকর্ষণ থাকে, সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য। আর মানুষের মনের কথা বা সুরকে কখনও থামানো যায় না, কারণ মানুষের ভেতরের কণ্ঠ কখনো নিষিদ্ধ হয় না...
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী
